জুলাই মাসে ১২ কেজি এলপিজি গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৫২৮ টাকা। গত জুন মাসে একই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৮৮৫ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দাম কমেছে ৩৫৭ টাকা। নতুন এই মূল্য আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকেই কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে অটোগ্যাসের দামও কমানো হয়েছে। (The Daily Star)
যারা প্রতিদিন রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার করেন, তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। বিশেষ করে শহর ও গ্রামে যেসব পরিবার পাইপলাইনের গ্যাস সুবিধার বাইরে রয়েছেন, তাদের মাসিক ব্যয়ে এই মূল্য হ্রাস সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জুলাই মাসে ১২ কেজি এলপিজি গ্যাসের নতুন দাম
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সর্বশেষ ঘোষণায় ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বড় পরিসরে কমানো হয়েছে। নিচের টেবিলে জুন ও জুলাই মাসের দামের তুলনা দেওয়া হলো।
| বিষয় | জুন ২০২৬ | জুলাই ২০২৬ | পরিবর্তন |
|---|---|---|---|
| ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডার | ১,৮৮৫ টাকা | ১,৫২৮ টাকা | কমেছে ৩৫৭ টাকা |
| অটোগ্যাস (প্রতি লিটার) | ৮৬.৯৩ টাকা | ৭০.৪০ টাকা | কমেছে ১৬.৫৩ টাকা |
নতুন মূল্য আজ সন্ধ্যা থেকেই কার্যকর হয়েছে। ফলে যারা নতুন সিলিন্ডার কিনবেন, তারা এই কম দামে কিনতে পারবেন।
অটোগ্যাসের দামও কমেছে
শুধু গৃহস্থালির এলপিজি নয়, যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও উল্লেখযোগ্য হারে কমানো হয়েছে।আগে প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ছিল ৮৬ টাকা ৯৩ পয়সা। নতুন করে তা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০ টাকা ৪০ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি লিটারে ১৬ টাকা ৫৩ পয়সা কমেছে। অটোগ্যাস ব্যবহারকারী ব্যক্তিগত গাড়ি এবং বাণিজ্যিক যানবাহনের মালিকদের জন্যও এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।
গত মাসেও কমেছিল এলপিজির দাম
এটি টানা দ্বিতীয় মাস, যখন এলপিজির দাম কমানো হলো। এর আগে গত ২ জুনও বিইআরসি ১২ কেজির সিলিন্ডারের মূল্য ১ হাজার ৯৪০ টাকা থেকে কমিয়ে ১ হাজার ৮৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল।একই সময়ে অটোগ্যাসের দামও প্রতি লিটারে ২ টাকা ৫৭ পয়সা কমানো হয়েছিল।দুই মাসের ব্যবধানে মূল্য কমার এই ধারাবাহিকতা ভোক্তাদের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
বিইআরসি কীভাবে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে?
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের মূল্য, আমদানি ব্যয়, পরিবহন খরচ, বীমা, ডলার বিনিময় হার এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যয় বিশ্লেষণ করে প্রতি মাসে নতুন মূল্য নির্ধারণ করে।অর্থাৎ দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য পরিবর্তনই এলপিজির দামের সবচেয়ে বড় নিয়ামক।এই কারণেই কোনো কোনো মাসে দাম বাড়ে, আবার কোনো মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেও যায়।
কেন কমল এলপিজির দাম?
আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য হ্রাস পাওয়ায় দেশেও তার প্রভাব পড়েছে। বিইআরসি প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয় বিবেচনা করে নতুন মূল্য নির্ধারণ করে থাকে।বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট সময়ের মূল্য সমন্বয়ের কারণেই এই ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়।
একটি পরিবারের কত টাকা সাশ্রয় হবে?
একটি সাধারণ পরিবার মাসে যদি একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ব্যবহার করে, তাহলে জুলাই মাসে তাদের সরাসরি সাশ্রয় হবে ৩৫৭ টাকা।
যেসব পরিবার মাসে দুটি সিলিন্ডার ব্যবহার করে, তাদের ক্ষেত্রে মাসিক সাশ্রয় দাঁড়াবে ৭১৪ টাকা। বছরে এই হিসাব কয়েক হাজার টাকায় পৌঁছাতে পারে।
| মাসিক ব্যবহার | মাসিক সাশ্রয় |
|---|---|
| ১টি সিলিন্ডার | ৩৫৭ টাকা |
| ২টি সিলিন্ডার | ৭১৪ টাকা |
| ৩টি সিলিন্ডার | ১,০৭১ টাকা |
দাম কমার পর ভোক্তারা কী করবেন?
- নতুন নির্ধারিত মূল্য জেনে তারপর সিলিন্ডার কিনুন।
- রসিদ ছাড়া সিলিন্ডার কিনবেন না।
- খুচরা বিক্রেতা অতিরিক্ত টাকা চাইলে কারণ জানতে চান।
- সিলিন্ডারের সিল ও ওজন পরীক্ষা করুন।
- প্রয়োজনে ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
আমার পরিচিত একজন সম্প্রতি একটি সিলিন্ডার কেনার সময় সরকারি দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দাবি করা হয়েছিল। পরে সরকারি মূল্য দেখানোর পর অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়নি। তাই নতুন মূল্য জানা থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
দৈনন্দিন বাজারের সঙ্গে এলপিজির সম্পর্ক
জ্বালানির দাম কমলে অনেক সময় পরিবহন ব্যয়ও কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়। যদিও সব পণ্যের দাম সঙ্গে সঙ্গে কমে না, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে।আপনি চাইলে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সর্বশেষ মূল্যও দেখে নিতে পারেন: আনারসের দাম কত
১২ কেজি এলপিজি গ্যাসের দাম কমল, জুলাইয়ে এক সিলিন্ডারে সাশ্রয় ৩৫৭ টাকা
এলপিজি সিলিন্ডার কেনার সময় যেসব বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখবেন
দাম কমেছে বলে তাড়াহুড়া করে সিলিন্ডার কিনে ফেলবেন না। একজন সচেতন গ্রাহক হিসেবে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা জরুরি। এতে যেমন সঠিক মূল্য নিশ্চিত করা যায়, তেমনি নিরাপদ সিলিন্ডারও পাওয়া সম্ভব হয়।
- সিলিন্ডারের গায়ে থাকা সিল অক্ষত আছে কি না পরীক্ষা করুন।
- উৎপাদনের তারিখ ও পুনঃপরীক্ষার (Re-test) মেয়াদ দেখে নিন।
- নির্ধারিত খুচরা মূল্য সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা রাখুন।
- ওজন কম মনে হলে বিক্রেতার কাছেই যাচাই করুন।
- রসিদ ছাড়া সিলিন্ডার কিনবেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় কম দামের প্রলোভনে মেয়াদোত্তীর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার বিক্রির চেষ্টা করা হয়। তাই শুধু দাম নয়, নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারে নিরাপত্তার ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এলপিজি নিরাপদ জ্বালানি। তবে অসতর্কতা বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
- সিলিন্ডার সবসময় খাড়া অবস্থায় রাখুন।
- রান্নাঘরে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন।
- গ্যাসের গন্ধ পেলে সঙ্গে সঙ্গে চুলা বন্ধ করুন এবং বৈদ্যুতিক সুইচ ব্যবহার করবেন না।
- রেগুলেটর ও পাইপ নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা করুন।
- মেয়াদোত্তীর্ণ পাইপ বা রেগুলেটর ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন।
ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন হলে কী করবেন?
বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দাবি করলে সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। দোকানদার যদি সরকারি মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেন, তাহলে প্রথমে মূল্য তালিকা দেখতে চান।রসিদ সংগ্রহ করুন এবং প্রয়োজন হলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করুন। অভিযোগ করার সময় দোকানের নাম, ঠিকানা এবং কেনার রসিদ থাকলে বিষয়টি দ্রুত যাচাই করা সহজ হয়।
জুনে এলপিজির দাম কমলেও সব জ্বালানির দাম একসঙ্গে কমে না কেন?
অনেকেই মনে করেন, এলপিজির দাম কমলে সব ধরনের জ্বালানির দামও একই সময়ে কমা উচিত। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন।এলপিজির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের আমদানি মূল্য অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। অন্যদিকে অন্যান্য জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে ভিন্ন ব্যয় কাঠামো, কর, আমদানি খরচ এবং সরকারি নীতিমালা কাজ করে। তাই একটি জ্বালানির দাম কমলেই অন্যটির দাম একইভাবে পরিবর্তিত হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।এটিই জুলাই মাসের মূল্য পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি, যা অনেক ভোক্তার কাছে পরিষ্কার থাকে না।
আগামী মাসে এলপিজির দাম আরও কমতে পারে?
এর নির্দিষ্ট উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ বিইআরসি প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারের সর্বশেষ মূল্য, ডলারের বিনিময় হার এবং অন্যান্য ব্যয় বিশ্লেষণ করে নতুন মূল্য নির্ধারণ করে।যদি আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য আরও কমে, তাহলে দেশেও দাম কমার সম্ভাবনা থাকতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পেলে দেশীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
১২ কেজি এলপিজি গ্যাসের দাম নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
আজকের ১২ কেজি এলপিজি গ্যাসের দাম কত?
জুলাই মাসের জন্য বিইআরসি ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য ১,৫২৮ টাকা নির্ধারণ করেছে।
গত মাসের তুলনায় কত টাকা কমেছে?
জুন মাসে দাম ছিল ১,৮৮৫ টাকা। জুলাই মাসে তা কমে ১,৫২৮ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ কমেছে ৩৫৭ টাকা।
অটোগ্যাসের নতুন দাম কত?
বর্তমানে প্রতি লিটার অটোগ্যাসের মূল্য ৭০ টাকা ৪০ পয়সা।
বিইআরসি কেন প্রতি মাসে দাম পরিবর্তন করে?
আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য, আমদানি ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট খরচ বিবেচনা করে প্রতি মাসে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
একটি পরিবার মাসে কত টাকা সাশ্রয় করবে?
যদি মাসে একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়, তাহলে জুলাই মাসে প্রায় ৩৫৭ টাকা সাশ্রয় হবে।
সরকারি দামের চেয়ে বেশি নিলে কী করবেন?
রসিদ সংগ্রহ করুন এবং প্রয়োজন হলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করুন।
নতুন মূল্য কখন থেকে কার্যকর?
বিইআরসির ঘোষণা অনুযায়ী নতুন মূল্য বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে কার্যকর হয়েছে।
দাম কোথা থেকে যাচাই করবেন?
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের ঘোষণা এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য দেখে সর্বশেষ মূল্য নিশ্চিত করা উচিত।
শেষ কথা
জুলাই মাসে ১২ কেজি এলপিজি গ্যাসের দামে ৩৫৭ টাকা কমানো সাধারণ ভোক্তাদের জন্য বড় স্বস্তির খবর। একই সঙ্গে অটোগ্যাসের মূল্য কমায় ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহনের ব্যবহারকারীরাও কিছুটা সুবিধা পাবেন। তবে শুধু কম দাম দেখলেই হবে না, সঠিক মূল্য, নিরাপদ সিলিন্ডার এবং অনুমোদিত বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য কেনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনভাবে ক্রয় করলে যেমন অর্থ সাশ্রয় হবে, তেমনি নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব।


