দেশে কর্মরত বিদেশিদের ব্যাংক হিসাব খোলার নির্দেশ দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক—বাংলাদেশে বৈধ ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কাজ করা বিদেশি নাগরিকরা এখন প্রযোজ্য কেওয়াইসি বিধি মেনে ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ পাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৮ আগস্ট ২০২৬-এর সার্কুলারে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে হালনাগাদ ওয়ার্ক পারমিট যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
নির্দেশনাটি বিশেষভাবে ‘এ-৩’সহ অন্যান্য কর্মসংস্থান ভিসা ক্যাটাগরিতে থাকা বিদেশি কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তাঁদের বেতন ও ভাতা ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবে বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া হিসাব খোলার সুযোগ থাকবে না।
সংক্ষিপ্ত তথ্যঃ
- হালনাগাদ ওয়ার্ক পারমিট থাকলে বিদেশি নাগরিক ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবেন।
- ‘এ-৩’সহ অন্যান্য কর্মসংস্থান ভিসা ক্যাটাগরি এই নির্দেশনার আওতাভুক্ত।
- হিসাব খোলার আগে প্রচলিত কেওয়াইসি বিধি পরিপালন করতে হবে।
- দেশের সব তফসিলি ব্যাংককে নির্দেশনা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
দেশে কর্মরত বিদেশিদের ব্যাংক হিসাব খোলার নির্দেশের মূল কথা কী?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার মূল কথা হলো, বৈধ ওয়ার্ক পারমিটধারী বিদেশি কর্মীদের বেতন ও ভাতা গ্রহণের জন্য ব্যাংক হিসাব খোলার প্রক্রিয়া সহজভাবে সম্পন্ন করতে হবে। তাই ব্যাংকগুলোকে ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ যাচাই করে কেওয়াইসি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে হিসাব খোলার ব্যবস্থা নিতে হবে।
মঙ্গলবার ১৮ আগস্ট ২০২৬ বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে সার্কুলারটি জারি করা হয়। এরপর সার্কুলারটি দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।
অর্থাৎ, এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নয়। বরং দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর জন্য এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত নির্দেশনা। ফলে ব্যাংকগুলোকে নিজেদের শাখা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
কোন বিদেশি কর্মীরা এই সুবিধার আওতায় থাকবেন?
‘এ-৩’ ভিসা ক্যাটাগরিতে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকরা এই নির্দেশনার প্রধান আওতাভুক্ত। একই সঙ্গে অন্যান্য কর্মসংস্থান ভিসা ক্যাটাগরিতে থাকা বিদেশি কর্মীরাও শর্ত পূরণ করলে ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবেন।
যোগ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো হালনাগাদ ওয়ার্ক পারমিট। তবে ভিসা থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক হিসাব খোলার অধিকার তৈরি হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কর্মসংস্থান এবং বাংলাদেশে কাজ করার অনুমতি বৈধ কি না সেটিও ব্যাংককে নিশ্চিত করতে হবে।
ধরা যাক, কোনো বিদেশি নাগরিকের কর্মসংস্থান ভিসার মেয়াদ আছে কিন্তু ওয়ার্ক পারমিটের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক হিসাব খোলার আগে ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন হবে।
‘এ-৩’ ভিসার ক্ষেত্রে কেন ওয়ার্ক পারমিট গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে ‘এ-৩’ ভিসা ক্যাটাগরিতে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডা থেকে ওয়ার্ক পারমিট নিতে হয়। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে সেই অনুমতিপত্র নবায়ন করতে হয়। তাই ব্যাংক হিসাব খোলার সময় ওয়ার্ক পারমিটের বৈধতা একটি কেন্দ্রীয় যাচাইয়ের বিষয়।
এদিকে, বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৯ এপ্রিল জারি করা একটি পরিপত্রে ‘এ-৩’ ভিসা ক্যাটাগরিতে কর্মরত বিদেশিদের বেতন ও ভাতা ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহণের বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে ওই পরিপত্রের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
ব্যাংক হিসাব খোলার আগে কী কী যাচাই হবে?
ব্যাংক হিসাব খোলার আগে ব্যাংককে বিদেশি কর্মীর পরিচয় এবং কর্মসংস্থানের বৈধতা যাচাই করতে হবে। এর পাশাপাশি প্রচলিত কেওয়াইসি বিধি মানতে হবে। কেওয়াইসি বা Know Your Customer প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাংক গ্রাহকের পরিচয়, পেশা, অর্থের উৎস এবং হিসাব ব্যবহারের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে।
সার্কুলারে নির্দিষ্ট কোনো নতুন নথির তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। তাই বাস্তবে কোন কোন কাগজ লাগবে তা ব্যাংকের প্রযোজ্য কেওয়াইসি প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালার ওপর নির্ভর করবে। আবেদনকারীকে শাখায় যাওয়ার আগে ব্যাংকের নির্ধারিত সেবা ডেস্কে তথ্য জেনে নেওয়া ভালো।
- প্রথমে বিদেশি নাগরিকের পরিচয় ও ভিসা-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা।
- এরপর ওয়ার্ক পারমিট হালনাগাদ এবং বৈধ কি না তা নিশ্চিত করা।
- চাকরি বা নিয়োগের উদ্দেশ্য এবং বেতন গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বোঝা।
- একই সঙ্গে ব্যাংকের প্রচলিত কেওয়াইসি ও গ্রাহক যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা।
- সবশেষে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন শেষে হিসাব খোলার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া।
এই ধাপগুলোকে একটি ব্যবহারিক যাচাই-চক্র হিসেবে দেখা যায়। কোনো একটি নথি অসম্পূর্ণ থাকলে আবেদন আটকে যেতে পারে। তবে সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিষেধাজ্ঞা হিসেবে নয় বরং কেওয়াইসি বা নথি যাচাইয়ের ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হবে।
বিদেশি কর্মী ও নিয়োগদাতার জন্য নির্দেশনাটির অর্থ কী?
বিদেশি কর্মীর জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বেতন ও ভাতা গ্রহণের একটি আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং মাধ্যম পাওয়া। নগদে বেতন নেওয়ার পরিবর্তে ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের ফলে বেতন প্রদানের রেকর্ড সংরক্ষণ করা সহজ হয়। একইভাবে, নিয়োগদাতার ক্ষেত্রেও বেতন পরিশোধের প্রমাণ তৈরি হয়।
বিশেষ করে সীমিত মানবসম্পদ বা ছোট প্রশাসনিক টিম থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য নথি হালনাগাদ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একজন কর্মীর ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বেতন হিসাব চালু রাখার বিষয়ে ব্যাংক বা নিয়োগদাতা প্রশ্ন তুলতে পারে। তাই পারমিট নবায়নের তারিখ আলাদা তালিকায় রাখা কার্যকর অভ্যাস।
লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়া মানে সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা বা বিদেশে অর্থ পাঠানোর অনুমতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া নয়। বরং প্রতিটি লেনদেন সংশ্লিষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা, কর, অর্থপাচার প্রতিরোধ এবং ব্যাংকের নিজস্ব নীতির আওতায় থাকতে পারে। নির্দিষ্ট লেনদেনের আগে তাই ব্যাংকের অনুমোদিত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা উচিত।
| বিষয় | নির্দেশনার অবস্থান | ব্যবহারিক অর্থ |
|---|---|---|
| ভিসা ক্যাটাগরি | ‘এ-৩’সহ কর্মসংস্থান ভিসা | কর্মসংস্থানের বৈধ প্রমাণ প্রয়োজন |
| ওয়ার্ক পারমিট | হালনাগাদ ও বৈধ হতে হবে | মেয়াদ শেষ হলে আগে নবায়ন জরুরি |
| কেওয়াইসি | প্রচলিত বিধি পরিপালন বাধ্যতামূলক | পরিচয় ও হিসাব ব্যবহারের উদ্দেশ্য যাচাই হবে |
| বেতন ও ভাতা | ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রহণ করা যাবে | নিয়োগদাতা ও কর্মী উভয়ের লেনদেনের রেকর্ড থাকবে |
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
নতুন নির্দেশনাটি মূলত বৈধ বিদেশি কর্মীদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশের জটিলতা কমাতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের ওয়ার্ক পারমিটে ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন নেওয়ার শর্ত আছে তাঁদের জন্য বিষয়টি বাস্তবসম্মত সমাধান তৈরি করে।
অন্যদিকে, হালনাগাদ ওয়ার্ক পারমিট না থাকলে সুবিধাটি প্রযোজ্য হবে না। ব্যাংকগুলোকে কেওয়াইসি যাচাইও বাদ দেওয়া যাবে না। ফলে দ্রুত হিসাব খোলার প্রত্যাশা থাকলেও অসম্পূর্ণ নথি নিয়ে আবেদন করলে প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে।
- প্রথম সুবিধা: বেতন ও ভাতা গ্রহণের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি হবে।
- আরেকটি সুবিধা: নিয়োগদাতার বেতন পরিশোধের রেকর্ড সংরক্ষণ সহজ হবে।
- বাস্তব সুফল: বৈধ বিদেশি কর্মীদের ব্যাংকিং সেবায় প্রবেশের জটিলতা কমতে পারে।
- তবে সীমাবদ্ধতা: ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ থাকলে হিসাব খোলার সুযোগ থাকবে না।
- আরও একটি সীমা: কেওয়াইসি ও ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ যাচাই সম্পন্ন না হলে আবেদন অনুমোদিত নাও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের দৃষ্টিতে, নীতিটির ভারসাম্য এখানেই। একদিকে বৈধ কর্মসংস্থানের বেতন ব্যাংকিং চ্যানেলে আনার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে পরিচয়, কর্মসংস্থান এবং অর্থের উৎস যাচাইয়ের নিয়ন্ত্রক কাঠামো অক্ষুণ্ন থাকছে।
আবেদনকারী ও নিয়োগদাতা দুপক্ষের জন্য ব্যবহারিক সতর্কতাগুলো হলো:
- প্রথমেই ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ ও নবায়নের তারিখ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করুন।
- এছাড়া ব্যাংকে জমা দেওয়া নথির কপি এবং আবেদনসংক্রান্ত রসিদ রাখুন।
- বেতন পরিশোধের উদ্দেশ্যে হিসাব খোলা হলে নিয়োগদাতার তথ্য সঠিকভাবে দিন।
- বিদেশে অর্থ পাঠানো বা বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের আগে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে নিয়ম জেনে নিন।
- চূড়ান্ত তথ্যের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নির্দেশনা যাচাই করুন।
সাধারণ প্রশ্ন
বিদেশি নাগরিকের ব্যাংক হিসাব খুলতে কি বৈধ ওয়ার্ক পারমিট বাধ্যতামূলক?
নির্দেশনা অনুযায়ী হালনাগাদ ওয়ার্ক পারমিট থাকতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকের প্রচলিত কেওয়াইসি বিধি পূরণ করাও প্রয়োজন।
ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হলে কী করা উচিত?
প্রথমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়ম অনুযায়ী ওয়ার্ক পারমিট নবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। মেয়াদহীন পারমিট নিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলার নিশ্চয়তা নেই।
এই নির্দেশনায় কি কেওয়াইসি প্রক্রিয়া বাতিল হয়েছে?
না, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে প্রচলিত কেওয়াইসি বিধি পরিপালনের শর্ত রাখা হয়েছে। তাই পরিচয় ও কর্মসংস্থানের তথ্য ব্যাংককে যাচাই করতে হবে।
বিদেশি কর্মীরা কি ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন ও ভাতা নিতে পারবেন?
বৈধ ওয়ার্ক পারমিট এবং প্রয়োজনীয় কেওয়াইসি পূরণ করলে ‘এ-৩’সহ কর্মসংস্থান ভিসাধারীরা ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন ও ভাতা গ্রহণ করতে পারবেন।


