মহরম ও আশুরা তাৎপর্য বুঝতে হলে এটিকে ইতিহাস, ইবাদত ও আত্মত্যাগের সমন্বিত শিক্ষা হিসেবে দেখতে হয়। প্রথমত, মহররম হলো আরবি হিজরি সনের প্রথম মাস। এই মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। আশুরার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আমল হলো রোজা রাখা। একই সঙ্গে কারবালার ঘটনা মুসলিমদের সত্য, ন্যায় ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকার শিক্ষা দেয়। তাই ২০২৬ সালেও এই দিনের মর্যাদা বোঝার ক্ষেত্রে সহিহ হাদিস ও গ্রহণযোগ্য ইতিহাসকে ভিত্তি করা জরুরি।
একটি ক্যালেন্ডারের প্রথম পৃষ্ঠা যেমন নতুন হিসাবের কথা মনে করায়, মহররমও তেমনি আত্মশুদ্ধির সুযোগ তৈরি করে। তবে আশুরা সম্পর্কে প্রচলিত সব বক্তব্য সমানভাবে নির্ভরযোগ্য নয়। তাই ইবাদতের ফজিলত, ঐতিহাসিক ঘটনা এবং দুর্বল বর্ণনা আলাদা করে দেখা দরকার।
মহরম ও আশুরা তাৎপর্য কীভাবে বোঝা যায়?
মহরম ও আশুরা তাৎপর্য মূলত তিনটি স্তরে ব্যাখ্যা করা যায়: মহররম মাসের পবিত্রতা, আশুরার রোজার সুন্নাহ এবং কারবালার নৈতিক শিক্ষা। প্রথমেই মনে রাখা দরকার, আশুরা কোনো উৎসবের দিন নয়। বরং এটি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, আত্মসংযম, তওবা ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থানের দিন।
- পবিত্রতা: মহররম চারটি সম্মানিত মাসের একটি।
- ইবাদত: আশুরার রোজা আগের বছরের ছোট গুনাহ মাফের আশার আমল।
- ইতিহাস: হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম কারবালায় ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীরা শহীদ হন।
- শিক্ষা: অন্যায়ের কাছে নতি স্বীকার না করে সত্য ও ন্যায়কে আঁকড়ে থাকা।
মহররমের মর্যাদা কোরআনে নির্দিষ্ট নামের তালিকা হিসেবে নয় বরং সম্মানিত মাসগুলোর প্রসঙ্গে এসেছে। এ বিষয়ে সূরা আত-তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াত পাঠ করা যেতে পারে। ফলে মহররমে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা এবং নেক আমল বাড়ানো একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মিক অনুশীলন।
আশুরার দিনে কোন ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল?
আশুরাকে ঘিরে আদম (আ.), নূহ (আ.), মুসা (আ.), ইব্রাহিম (আ.) ও ইউনুস (আ.)-এর নানা ঘটনা মুসলিম সমাজে প্রচলিত। তবে এসব ঘটনার সবগুলোর পক্ষে সমান শক্তিশালী সহিহ দলিল পাওয়া যায় না। তাই নিশ্চিত তথ্য ও জনপ্রিয় বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য রাখা ইসলামী লেখালেখিতে জরুরি।
মুসা (আ.) ও ফেরাউনের ঘটনা
সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, আশুরার দিনে আল্লাহ মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা করেন। একই সময়ে ফেরাউন ও তার বাহিনী ডুবে যায়। কৃতজ্ঞতা প্রকাশে মুসা (আ.) এই দিনে রোজা রাখতেন। পরে রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় ইহুদিদের এই রোজা পালন করতে দেখে সাহাবিদেরও রোজা রাখার নির্দেশ দেন।
ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি ইহুদিদের সাদৃশ্য এড়াতে ৯ মহররমের রোজাও রাখার সংকল্প করেছিলেন। এই হাদিসের তথ্য সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় পাওয়া যায়।
আদম, নূহ, ইব্রাহিম ও ইউনুস (আ.)-এর বর্ণনা
আদম (আ.)-এর সৃষ্টি ও তওবা কবুল, নূহ (আ.)-এর কিশতি জুডি পাহাড়ে ভেড়া, ইব্রাহিম (আ.)-এর আগুন থেকে রক্ষা এবং ইউনুস (আ.)-এর মাছের পেট থেকে মুক্তির ঘটনা আশুরার সঙ্গে যুক্ত করে বলা হয়। এগুলো ইসলামী ইতিহাস ও ওয়াজে পরিচিত বর্ণনা হলেও সবগুলোর সনদ সহিহ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত নয়।
সুতরাং এসব ঘটনা বলার সময় “প্রচলিত বর্ণনা” বা “কিছু বর্ণনায় উল্লেখ আছে” বলা বেশি সতর্ক ও নির্ভরযোগ্য। একইভাবে, যাচাই ছাড়া কোনো দুর্বল তথ্যকে নিশ্চিত হাদিস হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
কারবালার ঘটনা আশুরার তাৎপর্যকে কেন গভীর করেছে?
হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম কারবালার প্রান্তরে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের একটি অংশ ইয়াজিদের বাহিনীর হাতে শাহাদাতবরণ করেন। ফলে এই ঘটনা মুসলিম ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি।
কারবালা শুধু শোকের কাহিনি নয়। বরং এটি ন্যায়বোধ, আত্মমর্যাদা, সত্যের প্রতি আনুগত্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ মুসলিমদের মনে প্রশ্ন তোলে: ক্ষমতা বা নিরাপত্তার জন্য কি সত্যকে বিসর্জন দেওয়া যায়? তাই কারবালার শিক্ষা সেই প্রশ্নের নৈতিক উত্তর খুঁজতে সাহায্য করে।
তবে কারবালা স্মরণ করার অর্থ শরিয়তবিরোধী আচরণ করা নয়। নিজের শরীরে আঘাত করা, মাতমের নামে ক্ষতি করা বা বিদ্বেষ ছড়ানো ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং শোক প্রকাশের সঙ্গে কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া, সদকা ও ন্যায়পরায়ণতার সংকল্প যুক্ত করা অধিক অর্থবহ।
আশুরার রোজা কত দিন এবং কীভাবে রাখা হয়?
আশুরার রোজার উত্তম পদ্ধতি হলো ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখা। তবে শুধু ১০ মহররম রোজা রাখাও বৈধ বলে বহু আলেম মত দিয়েছেন। অবশ্য ৯ তারিখ যুক্ত করার বিষয়টি ইবনে আব্বাস (রা.)-এর হাদিসে বিশেষভাবে এসেছে।
- সম্ভব হলে ৯ ও ১০ মহররম রোজা রাখুন।
- ৯ তারিখে সম্ভব না হলে ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখতে পারেন।
- সাহরি ও ইফতারের সময় বাংলাদেশের স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সময়সূচি অনুসরণ করুন।
- রোজার পাশাপাশি ফরজ নামাজ, তওবা, দোয়া ও সদকার প্রতি মনোযোগ দিন।
- রোজার ফজিলতকে ছোট গুনাহ মাফের আশা হিসেবে বুঝুন। তবে এটি কবিরা গুনাহের বিকল্প নয়।
সহিহ মুসলিমে আশুরার রোজার মাধ্যমে আগের বছরের ছোট গুনাহ মাফের আশার কথা বর্ণিত হয়েছে। একই হাদিসে ৯ মহররমের রোজা যুক্ত করার ইচ্ছার কথাও এসেছে। তাই বিস্তারিত সূত্র হিসেবে সহিহ মুসলিম ১১৬২এ দেখা যেতে পারে।
আশুরায় পরিবারের জন্য বেশি খরচ করা কি সুন্নাহ?
আশুরায় পরিবার-পরিজনের জন্য কিছুটা সচ্ছলভাবে খরচ করা বা ভালো খাবার প্রস্তুত করার কথা কিছু বর্ণনায় পাওয়া যায়। তবে এই ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। তাই এটিকে আশুরার নিশ্চিত সুন্নাহ বা বাধ্যতামূলক আমল বলা ঠিক নয়।
| আমল | দলিলের অবস্থান | বাস্তব করণীয় |
|---|---|---|
| আশুরার রোজা | সহিহ হাদিসে প্রতিষ্ঠিত | ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখা |
| পরিবারের ব্যয় বৃদ্ধি | বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মতভেদ আছে | সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার বা উপহার দেওয়া যেতে পারে |
| বিশেষ শোকানুষ্ঠান | শরিয়তের নির্দিষ্ট বিধান নয় | ক্ষতিকর আচরণ ও বিদ্বেষ এড়িয়ে দোয়া করা |
ধরা যাক, কোনো পরিবার আশুরায় স্বাভাবিক বাজেটের মধ্যে শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবার তৈরি করল এবং দরিদ্র প্রতিবেশীর জন্য খাবার পাঠাল। এতে পারিবারিক সৌহার্দ্য ও দানের অভ্যাস তৈরি হয়। কিন্তু ধার করে বড় আয়োজন করা বা এটিকে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা মনে করা দরকার নেই।
নতুন পাঠক ও অভিজ্ঞ আমলকারীর জন্য করণীয় কী?
শুরু করছেন যারা
নতুন কেউ আশুরার আমল শুরু করলে আগে রোজার নিয়ত, নামাজের সময় ও স্থানীয় চাঁদ দেখার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া উচিত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তারিখ জানতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ বা সংশ্লিষ্ট সরকারি ঘোষণার ওপর নির্ভর করা নিরাপদ। তাই মতভেদপূর্ণ বর্ণনা নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে সহিহ আমল দিয়ে শুরু করাই সহজ পথ।
যারা নিয়মিত আমল করেন
অভিজ্ঞ আমলকারী আশুরার রোজার সঙ্গে আত্মসমালোচনা, কোরআন অধ্যয়ন, সদকা ও অন্যায় বর্জনের পরিকল্পনা যুক্ত করতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে, একদিনের জন্য মিথ্যা কথা না বলা, কারও পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া বা পরিবারের সঙ্গে কারবালার নৈতিক শিক্ষা আলোচনা করা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।
আশুরা পালনে কোন ভুলগুলো এড়ানো উচিত?
- দুর্বল বা অপ্রমাণিত বর্ণনাকে সহিহ হাদিস হিসেবে প্রচার করা।
- কারবালার শোককে কেন্দ্র করে অন্য মুসলিম গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো।
- শরীরের ক্ষতি করে মাতম বা শোক প্রকাশ করা।
- পরিবারের খরচ বাড়ানোকে বাধ্যতামূলক ধর্মীয় বিধান মনে করা।
- শুধু খাবারের আয়োজন করে রোজা, নামাজ ও আত্মশুদ্ধিকে উপেক্ষা করা।
- বাংলাদেশে আশুরার তারিখ সম্পর্কে সরকারি ঘোষণা না দেখে অনুমান করা।
বিশেষজ্ঞদের একটি কার্যকর পরামর্শ হলো, প্রতিটি আমলের ক্ষেত্রে তিনটি প্রশ্ন করা: দলিলটি কতটা নির্ভরযোগ্য, আমলটি শরিয়তসম্মত কি না এবং এতে কারও ক্ষতি হচ্ছে কি না। ফলে এই তিনটি যাচাই আশুরার ধর্মীয় আবেগকে সঠিক ভারসাম্যে রাখতে সাহায্য করে।
মহরম ও আশুরা তাৎপর্য নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন
মহররম মাসের ১০ তারিখকে কী বলা হয়?
মহররম মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। আরবি “আশারা” শব্দের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। তাই ইসলামী ক্যালেন্ডারে এটি একটি মর্যাদাপূর্ণ দিন।
আশুরার রোজা কি এক দিন রাখা যায়?
হ্যাঁ, শুধু ১০ মহররম রোজা রাখা যায়। তবে ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে দুই দিন রোজা রাখা উত্তম বলে আলেমরা উল্লেখ করেন।
আশুরার রোজায় কী ফজিলত রয়েছে?
সহিহ হাদিসে আশুরার রোজার মাধ্যমে আগের বছরের ছোট গুনাহ মাফের আশার কথা এসেছে। তবে কবিরা গুনাহের জন্য আলাদা তওবা ও সংশোধন জরুরি।
কারবালার ঘটনা কোন সালে ঘটেছিল?
কারবালার ঘটনা হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম ঘটেছিল। ওই দিন ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাত মুসলিম ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
আশুরায় ভালো খাবার রান্না করা কি বাধ্যতামূলক?
না, ভালো খাবার রান্না করা বাধ্যতামূলক নয়। পরিবারের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করা যেতে পারে। তবে এই আমলের বিশেষ ফজিলত সম্পর্কিত বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলেমদের মতভেদ রয়েছে।
আশুরায় কী ধরনের শোক পালন করা উচিত?
কারবালার ঘটনা স্মরণ করে দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত, সদকা ও ন্যায়ের পক্ষে থাকার সংকল্প করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নিজের শরীরে আঘাত করা বা বিদ্বেষ ছড়ানো থেকে বিরত থাকা উচিত।


