কয়েক দোকান ঘুরেও মিলছে না সয়াবিন তেল

কয়েক দোকান ঘুরেও মিলছে না সয়াবিন তেল—রাজধানীর খুচরা বাজারে এমন অভিজ্ঞতার মুখে পড়ছেন অনেক ক্রেতা। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর বাজারচিত্রে দেখা যাচ্ছে, আধা লিটার ও এক লিটারের বোতল প্রায় নেই। কোথাও পাওয়া গেলেও অনেক সময় ২ বা ৫ লিটারের বোতল ছাড়া বিকল্প থাকছে না।

ফলে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। এক লিটারের বোতল খুঁজতে কেউ কেউ চার-পাঁচটি দোকান ঘুরছেন। আবার দুই লিটারের বোতল কিনতে গিয়ে অন্য নিত্যপণ্য না নিয়েই বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।

  • বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমেছে বিশেষ করে আধা লিটার ও এক লিটারের প্যাকেটে।
  • প্রতি লিটারে দাম বেড়ে হয়েছে ২০৪ টাকা।
  • খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০৫ থেকে ২০৮ টাকা দরে।
  • এদিকে ফার্মের মুরগির ডিমের দাম ডজনে বেড়েছে সর্বোচ্চ ৫ টাকা।

কয়েক দোকান ঘুরেও মিলছে না সয়াবিন তেল

কয়েক দোকান ঘুরেও মিলছে না সয়াবিন তেল—রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে শুক্রবারের প্রধান ভোগান্তি ছিল এটিই। দু-একটি দোকানে বোতলজাত তেল পাওয়া গেলেও আধা লিটার ও এক লিটারের বোতল মেলেনি বললেই চলে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ২ লিটার বা ৫ লিটারের বোতলই ছিল বিক্রির জন্য।

খুচরা বিক্রেতা ও পাইকারি সরবরাহকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২ সেপ্টেম্বর ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর পরও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। তাদের দাবি, ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেল আগের তুলনায় কম ছাড়ছে।

পরিবেশকদের কাছে বারবার তাগাদা দিয়েও অনেক দোকানি পণ্য পাচ্ছেন না। বর্তমানে মাত্র দু-তিনটি কোম্পানি বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজারে দিচ্ছে বলে বিক্রেতারা জানিয়েছেন। তাই চাহিদার তুলনায় সেই সরবরাহ সামান্য হওয়ায় ছোট প্যাকেটের সংকট সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে।

কেন ছোট বোতল আগে উধাও হচ্ছে?

ছোট বোতলের সরবরাহ কমে যাওয়ার ফলে সীমিত বাজেটের ক্রেতারাই সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন। এক লিটারের বোতল কিনলে একবারে ২০৪ টাকা খরচ হয়। কিন্তু ২ লিটারের বোতল নিতে হলে ৪০৮ টাকা এবং ৫ লিটারের জন্য ১,০২০ টাকা একসঙ্গে দিতে হচ্ছে।

ধরা যাক, একটি পরিবারের সাপ্তাহিক বাজারের জন্য তেলের বাজেট ২৫০ টাকা। ওই পরিবার এক লিটারের বোতল কিনে বাকি টাকা ডিম বা সবজিতে ব্যয় করতে পারত। তবে ছোট বোতল না থাকায় ২ লিটারের বোতল কিনলে সেই পরিকল্পনা বদলে যায়। ফলে এই খরচের চাপই সংকটকে শুধু সরবরাহের সমস্যা না রেখে পারিবারিক বাজেটের সমস্যায় পরিণত করছে।

প্যাকেট বা তেলের ধরনবাজারদরক্রেতার ওপর প্রভাব
১ লিটার বোতলজাত সয়াবিন২০৪ টাকাপ্রয়োজনমতো কেনার সুযোগ থাকলে খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে
২ লিটার বোতলজাত সয়াবিন৪০৮ টাকাএকবারে বেশি টাকা ব্যয় করতে হয়
৫ লিটার বোতলজাত সয়াবিন১,০২০ টাকাবড় পরিবারে সুবিধা থাকলেও সীমিত বাজেটে চাপ বাড়ে
খোলা সয়াবিন তেলপ্রতি লিটার ২০৫–২০৮ টাকাপ্যাকেটের বিকল্প মিললেও দাম সামান্য বেশি
পাম তেলপ্রতি লিটার ১৮০–১৮৫ টাকাদামের দিক থেকে তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল

লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, খোলা সয়াবিন তেলের দাম বোতলজাত তেলের নির্ধারিত দামের চেয়েও প্রতি লিটারে ১ থেকে ৪ টাকা বেশি। তাই ছোট প্যাকেট না পাওয়া ক্রেতা বিকল্প হিসেবে খোলা তেল নিলেও সবসময় সাশ্রয় করতে পারছেন না।

বিক্রেতাদের মুনাফা কতটা কমেছে?

বিক্রেতারা জানিয়েছেন, তেল কোম্পানিগুলো তাদের বিক্রির কমিশন কমিয়ে প্রতি লিটারে মাত্র ১ টাকা করেছে। উপরন্তু সরবরাহও অনিয়মিত হওয়ায় কম কমিশন ও কম বিক্রি—দুই দিক থেকেই দোকানিরা চাপে আছেন।

রামপুরার ভাই ভাই স্টোরের দোকানি আফজাল হোসেনের বক্তব্য, ৫ লিটার তেল কিনলে ক্রেতারা এমনিতেই ৫ থেকে ১০ টাকা কম দিতে চান। এখন দোকানির মুনাফা দাঁড়াচ্ছে মাত্র ৫ টাকা। অর্থাৎ ১,০০০ টাকা বিনিয়োগ করে লাভ থাকছে ৫ টাকা।

এই হিসাবের আরেকটি দিকও আছে। দোকানি পণ্য কিনে টাকা আটকে রাখছেন, অথচ নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় বিক্রির ধারাবাহিকতা বজায় থাকছে না। ফলে বেশি প্যাকেট মজুত করার আগ্রহ কমতে পারে। তবে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সেই প্রভাবের পুরোটা ক্রেতার ওপরই পড়ছে।

ক্রেতারা কোন বিকল্প বেছে নিতে পারেন?

কয়েক দোকান ঘুরেও মিলছে না সয়াবিন তেল—এমন পরিস্থিতিতে কেনার আগে প্যাকেটের পরিমাণ ও মোট খরচ মিলিয়ে দেখা জরুরি। শুধু প্রতি লিটারের দাম দেখলে হবে না। বরং একবারে কত টাকা বেরিয়ে যাচ্ছে সেটিও পারিবারিক বাজেটের অংশ।

  1. প্রথমে প্রয়োজনের পরিমাণ ঠিক করুন: এক সপ্তাহের জন্য এক লিটার যথেষ্ট হলে শুধু সংকটের কারণে ৫ লিটারের বোতল নেওয়া প্রয়োজন নেই।
  2. দুই-তিনটি দোকানে দর যাচাই করুন: কারণ একই বাজারে প্যাকেটের আকার ও সরবরাহে পার্থক্য থাকতে পারে।
  3. খোলা তেল নিলে পরিষ্কার পাত্র ব্যবহার করুন: পাশাপাশি তেলের রং, গন্ধ ও বিক্রয়স্থলের পরিচ্ছন্নতা খেয়াল করুন।
  4. পাম তেল বিবেচনা করুন: রান্নার ধরন ও পরিবারের পছন্দের সঙ্গে মিললে ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকা দরের পাম তেল বাজেট কমাতে পারে।
  5. দাম ও পরিমাণ মিলিয়ে রসিদ রাখুন: তাই ভুল মাপ বা অস্বাভাবিক দামের বিষয়ে পরে কথা বলার জন্য কেনার তথ্য কাজে লাগে।

ডিমের বাজারে কী পরিবর্তন এসেছে?

সয়াবিন তেলের সংকটের পাশাপাশি রাজধানীর খুচরা বাজারে ফার্মের মুরগির ডিমের দামও বেড়েছে। এক সপ্তাহ আগে প্রতি ডজন ডিম ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বাজারভেদে ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ ডজনে সর্বোচ্চ ৫ টাকা বেড়েছে।

বিক্রেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুদিন ধরে ফার্মের ডিমের দাম ঊর্ধ্বমুখী। অন্যদিকে ব্রয়লার মুরগির ডিমের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩৩০ থেকে ৩৪০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।

সীমিত বাজেটের একটি পরিবারের ক্ষেত্রে ডিমের দামে ডজনে ৫ টাকা বৃদ্ধি ছোট মনে হলেও সপ্তাহে একাধিক ডজন কিনলে মাসিক বাজারে তার প্রভাব জমে যায়। তেলের বড় প্যাকেট কেনার অতিরিক্ত চাপের সঙ্গে এই ব্যয় যোগ হলে নিত্যপণ্যের তালিকা ছোট করার প্রয়োজন তৈরি হতে পারে।

সবজির বাজার কি স্থিতিশীল?

ঢাকার বাজারে বিভিন্ন সবজির দাম খানিকটা চড়া হলেও সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। তবে পণ্যভেদে ও বাজারভেদে পার্থক্য আছে। ঢ্যাঁড়স ও পটলের দাম কিছুদিন কমে ৪০ থেকে ৫০ টাকায় নেমেছিল। এখন আবার সেগুলো ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

সবজিপ্রতি কেজি দাম
শসা৫০–৬০ টাকা
দেশি লাউ৬০–৭০ টাকা
লম্বা বেগুণ১০০–১২০ টাকা
কচুর মুখি৫৫–৭০ টাকা
করলা৭০–১০০ টাকা
চিচিংগা৫০–৮০ টাকা
বরবটি১০০–১৩০ টাকা
ঝিঙা ও কাকরোল৭০–৯০ টাকা
কাঁচা মরিচ১৪০–১৮০ টাকা

কাঁচা মরিচের দামে পরিবর্তনটি তুলনামূলক বেশি চোখে পড়ছে। আগে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে পাওয়া গেলেও এখন বাজারভেদে ১৪০ থেকে ১৮০ টাকা লাগছে। ফলে রান্নায় অল্প পরিমাণে ব্যবহার হলেও এই বৃদ্ধির প্রভাব ছোট বাজারেও ধরা পড়ছে।

বাজারে যাওয়ার আগে কী হিসাব করবেন?

বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু সস্তা পণ্য খোঁজার বদলে মোট ব্যয় ও প্রয়োজনের সমন্বয় করা বেশি কার্যকর। তেল, ডিম ও সবজির দাম একসঙ্গে বদলালে প্রতিটি পণ্যে সামান্য সাশ্রয় করেও মাসিক খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

  • তেলের প্যাকেটের পরিমাণ দেখে মোট দাম হিসাব করুন।
  • খোলা তেল নিলে বিক্রেতার পাত্র ও সংরক্ষণব্যবস্থা পরীক্ষা করুন।
  • ডিম কেনার সময় ডজনপ্রতি দাম নয়, পরিবারের সাপ্তাহিক প্রয়োজনও বিবেচনা করুন।
  • কাঁচা মরিচের মতো বেশি দামের পণ্য কম পরিমাণে কিনে অন্য সবজির সঙ্গে ভারসাম্য রাখুন।
  • একটি দোকানে সব পণ্য না পেলে কাছাকাছি বাজারের দাম তুলনা করুন।

সাধারণ একটি ভুল হলো, সংকটের সময় প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি পণ্য কিনে ফেলা। এতে সাময়িক নিশ্চিন্তি এলেও একবারে বড় অঙ্কের টাকা খরচ হয়। আবার অতিরিক্ত মজুতের কারণে পরিবারের অন্য জরুরি বাজার বাদ পড়তে পারে।

সাধারণ প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর

এক লিটার সয়াবিন তেলের দাম কত?

বোতলজাত সয়াবিন তেলের প্রতি লিটারের দাম ২০৪ টাকা। তবে দোকানে প্যাকেটের প্রাপ্যতা ও বিক্রির ধরন অনুযায়ী বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

কেন এক লিটারের বোতল পাওয়া যাচ্ছে না?

খুচরা বিক্রেতা ও সরবরাহকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিশোধনকারী কোম্পানিগুলো বোতলজাত তেল কম ছাড়ছে। তাই সংকটটি আধা লিটার ও এক লিটারের প্যাকেটে বেশি।

দুই লিটার সয়াবিন তেলের দাম কত?

প্রতি লিটার ২০৪ টাকা হিসাবে দুই লিটার বোতলের দাম ৪০৮ টাকা। ফলে ছোট বোতল না পাওয়ায় অনেক ক্রেতাকে এই পরিমাণ একসঙ্গে কিনতে হচ্ছে।

খোলা সয়াবিন তেলের দাম কত?

খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ২০৫ থেকে ২০৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ বোতলজাত তেলের তুলনায় বাজারভেদে দাম কিছুটা বেশি।

পাম তেলের দাম কত?

রাজধানীর খুচরা বাজারে পাম তেল প্রতি লিটার ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। রান্নার উপযোগিতা ও পরিবারের পছন্দ বিবেচনা করে এটি বিকল্প হতে পারে।

ফার্মের ডিমের দাম কত?

ফার্মের মুরগির ডিম এখন প্রতি ডজন ১৫০ থেকে ১৫৫ টাকা। অন্যদিকে এক সপ্তাহ আগে একই ডিম ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।

ব্রয়লার মুরগির দাম কি বেড়েছে?

প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ১৮০ থেকে ১৯০ টাকার মধ্যে রয়েছে। সরবরাহ করা বাজারচিত্রে এই দামে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের কথা পাওয়া যায়নি।

কাঁচা মরিচের দাম কত?

কাঁচা মরিচ এখন বাজারভেদে প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ১৮০ টাকা। আগে এর দাম ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে ছিল।

দাম বাড়ার প্রভাব বুঝে বাজার করুন

কয়েক দোকান ঘুরেও মিলছে না সয়াবিন তেল—এই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় প্যাকেটের বাধ্যতামূলক ক্রয় এবং খোলা তেলের বাড়তি দাম। একই সময়ে ডিম ও কিছু সবজির দামও বেড়েছে। তাই বাজারে যাওয়ার আগে প্রয়োজনের তালিকা ও সর্বোচ্চ বাজেট নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ।

সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত প্যাকেটের আকার, মোট দাম ও বিকল্প তেলের দর মিলিয়ে কেনাকাটা করাই ভালো। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর এই বাজারদর পরিবর্তনশীল হতে পারে। তাই কেনার আগে স্থানীয় দোকান ও সরকারি তথ্যসূত্রে সর্বশেষ দাম যাচাই করে নিন।

Scroll to Top