সূর্যগ্রহণের পর এবার চন্দ্রগ্রহণ ২৮ আগস্ট ২০২৬-এর এই মহাজাগতিক ঘটনা বাংলাদেশে বসে দেখা যাবে না, যদিও উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান হতে পারে। চাঁদের প্রায় ৯৬ শতাংশ অংশ পৃথিবীর গভীর ছায়ায় ঢুকে যাওয়ায় গ্রহণটি জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করছে।
গ্রিনিচ মান সময় ভোর ৪টা ১২ মিনিটে গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায় হবে। বাংলাদেশ সময় তখন সকাল ১০টা ১২ মিনিট। ফলে সময়ের হিসাব জানলেও দেশের দর্শকদের জন্য সরাসরি আকাশ পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হবে না।
- তারিখ: ২৮ আগস্ট ২০২৬
- সর্বোচ্চ পর্যায়: বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ১২ মিনিট
- গ্রহণের ধরন: গভীর আংশিক চন্দ্রগ্রহণ
- বাংলাদেশে দৃশ্যমানতা: দেখা যাবে না
সূর্যগ্রহণের পর এবার চন্দ্রগ্রহণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সূর্যগ্রহণের পর এবার চন্দ্রগ্রহণ ঘটছে মাত্র দুই সপ্তাহের কিছু বেশি ব্যবধানে। তাই এই কাছাকাছি সময়ের ব্যবধান কেবল ক্যালেন্ডারের মিল নয়; সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের অবস্থান সাময়িকভাবে এমন বিন্যাস তৈরি করেছে, যেখানে গ্রহণের সম্ভাবনা বেড়েছে।
চন্দ্রগ্রহণ ঘটে যখন পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে এসে পড়ে এবং পৃথিবীর ছায়া চাঁদের ওপর পড়ে। তবে ২৮ আগস্টের ঘটনাটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ নয়। কারণ চাঁদের একটি ছোট অংশ পৃথিবীর গভীর ছায়ার বাইরে থাকবে।
আগে ১২ আগস্ট গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড ও স্পেনের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল। তার পরেই চন্দ্রগ্রহণের এই ঘটনা মহাজাগতিক গ্রহণের ধারাবাহিকতাকে আরও লক্ষণীয় করেছে।
২৮ আগস্টের গ্রহণ কতটা গভীর হবে?
২৮ আগস্ট ২০২৬-এর চন্দ্রগ্রহণে চাঁদের পৃষ্ঠের প্রায় ৯৬ শতাংশ ঢেকে যেতে পারে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে চাঁদের ব্যাসের প্রায় ৯৩ শতাংশ অংশ পৃথিবীর মূল ছায়া বা আমব্রার মধ্যে থাকবে। তাই এটি সাধারণ আংশিক গ্রহণের তুলনায় অনেক গভীর দৃশ্য তৈরি করবে।
গ্রহণটি মোট পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলবে। তবে গভীর আংশিক পর্যায় পুরো সময় স্থায়ী হবে না। অর্থাৎ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গ্রহণ দীর্ঘ হলেও সবচেয়ে নাটকীয় দৃশ্য দেখা যাবে তুলনামূলকভাবে ছোট একটি সময়ে।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সূর্যের আলোর কিছু অংশ ছেঁকে চাঁদের ছায়াচ্ছন্ন এলাকায় পৌঁছে দিতে পারে। এ কারণে ঢেকে যাওয়া অংশে লালচে বা তামাটে আভা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমন দৃশ্যকে সাধারণভাবে ‘ব্লাড মুন’ বলা হয়, যদিও এটি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ নয়।
কোন অঞ্চল থেকে গ্রহণ দেখা যাবে?
উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ২৮ আগস্টের চন্দ্রগ্রহণ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ইউরোপ ও আফ্রিকার কিছু এলাকায় স্থানীয় সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয়ের সময় গ্রহণের আংশিক দৃশ্য দেখা যেতে পারে।
| অঞ্চল | সম্ভাব্য দৃশ্যমানতা | বিশেষ শর্ত |
|---|---|---|
| উত্তর আমেরিকা | শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত | স্থানীয় আকাশ পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন |
| দক্ষিণ আমেরিকা | শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত | অঞ্চলভেদে সময়ের পার্থক্য থাকবে |
| ইউরোপ | আংশিক দৃশ্য | সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় |
| আফ্রিকা | আংশিক দৃশ্য | স্থানীয় দিগন্তে চাঁদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ |
| বাংলাদেশ | দৃশ্যমান নয় | সর্বোচ্চ পর্যায় দিনের বেলায় পড়বে |
লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, কোনো শহর গ্রহণের দৃশ্যমান অঞ্চলের মধ্যে থাকলেই পুরো ঘটনা দেখা যাবে না। স্থানীয় দিগন্ত, সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয়ের সময় এবং মেঘের অবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই পর্যবেক্ষণ পরিকল্পনায় শুধু বৈশ্বিক সময় নয়, নির্দিষ্ট এলাকার স্থানীয় সময়ও মিলিয়ে নিতে হয়।
বাংলাদেশ থেকে কেন দেখা যাবে না?
বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায় হবে সকাল ১০টা ১২ মিনিটে। কিন্তু এই সময়ে বাংলাদেশে চাঁদ আকাশে দৃশ্যমান থাকবে না। ফলে গ্রহণের বৈজ্ঞানিক ঘটনা ঘটলেও দেশের কোনো স্থান থেকে খালি চোখে সরাসরি তা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে না।
সাধারণ ভুল হলো, কোনো গ্রহণের আন্তর্জাতিক সময়কে বাংলাদেশের দৃশ্যমানতার সময় ধরে নেওয়া। কিন্তু গ্রহণ দেখা যাবে কি না তা নির্ভর করে স্থানীয় আকাশে চাঁদ তখন দিগন্তের ওপরে আছে কি না। তাই সময়ের রূপান্তর জানা প্রয়োজন, তবে সেটিই একমাত্র শর্ত নয়।
সীমিত বাজেটে জ্যোতির্বিজ্ঞান অনুসরণ করা বাংলাদেশি পাঠকের জন্য বাস্তবসম্মত উপায় হতে পারে নির্ভরযোগ্য মহাকাশ সংস্থা বা পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের সরাসরি সম্প্রচার খোঁজা। তবে কোনো অননুমোদিত ভিডিও বা সম্পাদিত ফুটেজকে বাস্তব পর্যবেক্ষণ ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
চন্দ্রগ্রহণ দেখার নিরাপদ উপায়
চন্দ্রগ্রহণ দেখার জন্য সূর্যগ্রহণের মতো বিশেষ চোখের সুরক্ষা প্রয়োজন নেই। তাই খালি চোখে চাঁদের দিকে তাকানো নিরাপদ। কারণ চাঁদ নিজে তীব্র আলো তৈরি করে না; এটি সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে।
আরও স্পষ্টভাবে দেখতে সাধারণ বাইনোকুলার বা টেলিস্কোপ ব্যবহার করা যায়। তবে যন্ত্রের মানের চেয়ে পর্যবেক্ষণের স্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। উজ্জ্বল রাস্তার আলো থেকে দূরে, খোলা জায়গায় দাঁড়ালে চাঁদের ছায়ার পরিবর্তন সহজে বোঝা যায়।
- প্রথমে স্থানীয় সময় অনুযায়ী গ্রহণের পর্যায় যাচাই করুন।
- এরপর খোলা দিগন্তসহ আলো কম এমন জায়গা বেছে নিন।
- চাঁদ দৃশ্যমান না হলে কোনো যন্ত্র ব্যবহার করে খোঁজার চেষ্টা করবেন না।
- বাইনোকুলার ব্যবহার করলে স্থিরভাবে ধরে বা ট্রাইপডে বসিয়ে পর্যবেক্ষণ করুন।
- সবশেষে ছবি তুলতে মোবাইল ক্যামেরার এক্সপোজার কমিয়ে কয়েকটি পরীক্ষামূলক শট নিন।
যে ভুলগুলো পর্যবেক্ষণ নষ্ট করতে পারে
সূর্যগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে অনেকেই চন্দ্রগ্রহণের ক্ষেত্রেও বিশেষ সুরক্ষাচশমা অপরিহার্য মনে করেন। তবে এই ধারণা সঠিক নয়। চন্দ্রগ্রহণে খালি চোখে দেখা নিরাপদ, যদিও সূর্যের দিকে তাকানোর ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য নয়।
আরেকটি ভুল হলো পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের মতো পুরো চাঁদ লাল হয়ে যাবে ধরে নেওয়া। বাস্তবে ২৮ আগস্টের ঘটনা গভীর আংশিক গ্রহণ। তাই চাঁদের একটি অংশ ছায়ার বাইরে থাকবে এবং লালচে আভা দেখা গেলেও পুরো গোলক একই রঙে ঢেকে যাওয়ার কথা নয়।
- বাংলাদেশের সময় দেখে স্থানীয় দৃশ্যমানতা নিশ্চিত না করা
- আংশিক গ্রহণকে পূর্ণ গ্রহণ হিসেবে প্রচার করা
- পাঁচ ঘণ্টার পুরো সময় গভীর ছায়া থাকবে মনে করা
- মেঘলা আকাশের সম্ভাবনা বিবেচনা না করা
- পুরনো গ্রহণের ছবি নতুন ঘটনার ছবি হিসেবে ব্যবহার করা
তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও সতর্কতা দরকার। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ‘ব্লাড মুন’ শব্দটি অনেক সময় পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। এখানে শব্দটি কেবল সম্ভাব্য লালচে বা তামাটে আভা বোঝায়, গ্রহণের ধরন নয়।
বাংলাদেশি দর্শকের জন্য বাস্তব হিসাব
বাংলাদেশে থাকা দর্শকের জন্য এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো দৃশ্যমানতা নেই। তাই ছাদে উঠে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা বা দামি সরঞ্জাম কেনা বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হবে না। বরং সময়ের রূপান্তর, গ্রহণের ধরন ও দৃশ্যমান অঞ্চল সম্পর্কে জানা শিক্ষামূলকভাবে বেশি কাজে দেবে।
ধরা যাক, কোনো শিক্ষার্থী ২৮ আগস্ট সকাল ১০টা ১২ মিনিটে ঢাকার আকাশে চাঁদ খুঁজতে গেল। তখন গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায় চললেও স্থানীয় আকাশে চাঁদ দৃশ্যমান না থাকায় পর্যবেক্ষণ সফল হবে না। ফলে এই উদাহরণটি দেখায়, বৈশ্বিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সময় আর স্থানীয় দৃশ্যমানতা এক বিষয় নয়।
খরচ কম রাখতে চাইলে নির্ভরযোগ্য মহাকাশ সংস্থার ওয়েবসাইট, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগ বা প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের যাচাইকৃত আপডেট অনুসরণ করা যায়। পাশাপাশি প্রকাশের সময় স্থানীয় সময় ও দৃশ্যমানতার তথ্য মিলিয়ে নেওয়া উচিত।
প্রশ্নগুলোর সংক্ষিপ্ত উত্তর
২৮ আগস্ট ২০২৬-এর চন্দ্রগ্রহণ বাংলাদেশে দেখা যাবে?
না। গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায় বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ১২ মিনিটে হবে, যখন বাংলাদেশের আকাশে চাঁদ দৃশ্যমান থাকবে না।
এটি কি পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ?
না। এটি গভীর আংশিক চন্দ্রগ্রহণ। চাঁদের প্রায় ৯৬ শতাংশ অংশ ঢেকে যেতে পারে, তবে একটি অংশ গভীর ছায়ার বাইরে থাকবে।
গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায় কখন?
গ্রিনিচ মান সময় ২৮ আগস্ট ভোর ৪টা ১২ মিনিটে সর্বোচ্চ পর্যায় হবে। বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী তা সকাল ১০টা ১২ মিনিট।
চাঁদ কি পুরোপুরি লাল হয়ে যাবে?
পুরো চাঁদ লাল হওয়ার কথা নয়। তবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাবে ছায়াচ্ছন্ন অংশে লালচে বা তামাটে আভা দেখা দিতে পারে।
চন্দ্রগ্রহণ দেখতে বিশেষ চশমা লাগবে?
চাঁদের গ্রহণ দেখার জন্য বিশেষ সুরক্ষাচশমা প্রয়োজন নেই। খালি চোখে দেখা নিরাপদ। চাইলে সাধারণ বাইনোকুলার বা টেলিস্কোপ ব্যবহার করা যায়।
গ্রহণটি কতক্ষণ স্থায়ী হবে?
শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটনাটি পাঁচ ঘণ্টারও বেশি চলবে। তবে গভীর আংশিক পর্যায় তুলনামূলকভাবে কম সময় থাকবে।
কোন দেশগুলো থেকে গ্রহণ দেখা যেতে পারে?
উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পুরো গ্রহণ দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে ইউরোপ ও আফ্রিকার কিছু এলাকায় সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয়ের সময় আংশিক দৃশ্য মিলতে পারে।
সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি


