২০২৬ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারি কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষার সুযোগকে আরও সুশৃঙ্খল করতে ‘জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা নীতিমালা, ২০২৩’ সংশোধন করেছে। এই পরিবর্তনের ফলে সরকারি চাকরিতে কর্মরতদের উচ্চশিক্ষা (Higher Education) এবং বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ (Foundation Training) গ্রহণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে পিএইচডি এবং মাস্টার্স করার সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ এবং গবেষণার অগ্রগতি প্রতিবেদনে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
আরও জেনে নিনঃ যা জানাল মন্ত্রণালয় এনআইডিতে অতিরিক্ত সিম বা হ্যান্ডসেট দেখানো নিয়ে
জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা নীতিমালা সংশোধনের প্রেক্ষাপট
সরকারি সেবাকে আরও গতিশীল এবং আধুনিক করতে কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন অপরিসীম। তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষার দীর্ঘসূত্রিতা দাপ্তরিক কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। এই সমস্যা সমাধানে এবং কর্মকর্তাদের একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দক্ষ করে তুলতে সরকার নতুন এই সংশোধনী এনেছে। গত ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে এই সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।


বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ বা Foundation Training-এর নতুন নিয়ম
সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর একজন কর্মকর্তার প্রথম এবং প্রধান ধাপ হলো বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ। নতুন নিয়মে এই প্রশিক্ষণের সময়সীমা নিয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
২ বছরের মধ্যে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক
সকল ক্যাডার এবং নবনিয়োগপ্রাপ্ত নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য চাকরিতে যোগদানের প্রথম ০২ (দুই) বছরের মধ্যে আবশ্যিকভাবে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হবে। এটি এখন আর ঐচ্ছিক বা দীর্ঘায়িত করার সুযোগ নেই।
আরও জেনে নিনঃ দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন ফলাফল জেনে নিন ২০২৬ এ
প্রশিক্ষণের মেয়াদ ও গ্রামীণ সংযুক্তি
সাধারণত বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের মেয়াদ হবে ০৪ (চার) মাস। এই প্রশিক্ষণের একটি বিশেষ অংশ হিসেবে কর্মকর্তাদের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সরাসরি কাজ করতে হবে। এর ফলে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে।
ক্যাডার বহির্ভূত কর্মকর্তাদের বয়সসীমা
যারা ক্যাডার বহির্ভূত বা নন-ক্যাডার থেকে ক্যাডার পদে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, তাদের জন্য বিশেষ বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ বছর।
উচ্চশিক্ষার জন্য বয়সের নতুন সীমা ২০২৬
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বয়সসীমা নির্ধারণ করা এই নীতিমালার অন্যতম প্রধান দিক। আগে এই বিষয়ে কিছুটা শিথিলতা থাকলেও এখন নির্দিষ্ট ছক অনুসরণ করতে হবে।
| ডিগ্রির ধরন | সর্বোচ্চ বয়সসীমা |
| পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা, মাস্টার্স, এম.ফিল, পিএইচডি | ৪৭ বছর |
| পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ (উচ্চশিক্ষা গ্রহণ) | ৫০ বছর |
| ফেলোশিপ ও মেন্টরশিপ | ৫৪ বছর |
এই ছক থেকে স্পষ্ট যে, একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি তার ক্যারিয়ারের মাঝপথে পিএইচডি বা মাস্টার্স করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই ৪৭ বছর বয়সের মধ্যে তা শুরু করতে হবে। এটি মূলত কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের একটি বড় অংশ যাতে দাপ্তরিক কাজে ব্যয় হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য করা হয়েছে।
পিএইচডি গবেষকদের জন্য কঠোর নির্দেশনা ও বেতন বন্ধের ঝুঁকি
নতুন নিয়মে পিএইচডি (PhD) গবেষকদের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। অনেক সময় প্রেষণ (Deputation) নিয়ে গবেষণার কাজ সঠিকভাবে না করার অভিযোগ ওঠে। এটি রোধে সরকার দুটি প্রধান শর্ত দিয়েছে:
১. বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা
পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের জন্য যারা প্রেষণ বা ছুটি পাবেন, তাদের প্রতি বছর গবেষণার অগ্রগতি সংক্রান্ত একটি প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে। এই প্রত্যয়নপত্রটি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক (Supervisor) এর কাছ থেকে সত্যায়িত হতে হবে এবং সেটি নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে।
২. প্রতিবেদন না দিলে বেতন বন্ধ
যদি কোনো কর্মকর্তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তার গবেষণার অগ্রগতির প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হন, তবে তার বেতন বন্ধ করে দেওয়া হবে। এটি একটি কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা যা গবেষণার নামে সময়ক্ষেপণ রোধ করবে।
প্রেষণ (Deputation) ও বৃত্তির নতুন নিয়মাবলী
সরকারি কর্মকর্তাদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে সরকার প্রেষণ বা বিশেষ ছুটি মঞ্জুর করে থাকে। তবে এর জন্য কিছু শর্ত পালন করতে হয়:
- পূর্ণবৃত্তি: কোনো কর্মচারী যদি কোনো বিদেশি সংস্থা বা সরকার থেকে পূর্ণবৃত্তি (Full Scholarship) পান, তবে তিনি ওই মেয়াদের জন্য প্রেষণ পাবেন।
- আংশিক বৃত্তি: আংশিক বৃত্তিপাপ্ত (Partial Scholarship) হলেও কর্মকর্তাদের প্রেষণ মঞ্জুর করা যেতে পারে, যদি তা দাপ্তরিক লক্ষ্যর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
দাপ্তরিক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা নবায়ন: বছরে ৬০ ঘণ্টা
শুধু দীর্ঘমেয়াদী উচ্চশিক্ষা নয়, সরকারি দপ্তরের অভ্যন্তরীণ কাজের দক্ষতা বাড়াতেও নতুন নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে।
ন্যূনতম ৬০ ঘণ্টার প্রশিক্ষণ
সকল সরকারি কর্মচারীর জন্য প্রতি অর্থবছর বা অর্ধবার্ষিকে ন্যূনতম ৬০ (ষাট) ঘণ্টা প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে। এটি কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক ফাইলিং, ই-নথি এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ করে তুলবে।
দক্ষতা নবায়ন প্রশিক্ষণ (Skill Refreshment Training)
বছরে অন্তত একবার ‘দক্ষতা নবায়ন প্রশিক্ষণের’ আয়োজন করতে হবে। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দাপ্তরিক কাজের জ্ঞান হালনাগাদ করার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন করা হবে।
FAQ
হ্যাঁ, নতুন নিয়ম অনুযায়ী চাকরিতে যোগদানের প্রথম ২ বছরের মধ্যে এটি সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক।
নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, পিএইচডি, মাস্টার্স বা এম.ফিলের জন্য সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৪৭ বছর।
জি, প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী প্রতি বছর অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা না দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বেতন বন্ধ রাখার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৫০ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রতিটি সরকারি কর্মচারীকে বছরে বা অর্ধবার্ষিকে ন্যূনতম ৬০ ঘণ্টা দাপ্তরিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে।


