সম্প্রতি অনেক মানুষ লক্ষ্য করেছেন যে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডির বিপরীতে সচল সিম বা হ্যান্ডসেটের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখাচ্ছে। এনআইডিতে অতিরিক্ত সিম দেখানোর এই বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন, উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, তাদের নামে অজান্তে সিম নিবন্ধন হয়েছে বা ব্যক্তিগত তথ্য ঝুঁকিতে পড়েছে। বাস্তবে বিষয়টি কী, কেন এমন হচ্ছে এবং এর সমাধান কী এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা এখন জরুরি।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এক ফেসবুক পোস্টে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এটি মূলত একটি টেকনিক্যাল ও ডেটা মাইগ্রেশনজনিত সমস্যা, যার সমাধান হতে কিছুটা সময় লাগবে।
NEIR কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
NEIR সিস্টেমের মূল ধারণা
NEIR বা National Equipment Identity Register হলো এমন একটি কেন্দ্রীয় সিস্টেম, যেখানে মোবাইল হ্যান্ডসেটের IMEI নম্বর নিবন্ধিত থাকে। এর মাধ্যমে অবৈধ, ক্লোন করা বা চোরাই হ্যান্ডসেট শনাক্ত করা সহজ হয়। একই সঙ্গে কোন এনআইডির বিপরীতে কতটি সিম ও ডিভাইস ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিও এই সিস্টেমে দেখা যায়।
কেন NEIR চালু করা হয়েছে
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ হ্যান্ডসেট ব্যবহার, ক্লোন IMEI এবং আর্থিক অপরাধের ঝুঁকি ছিল। NEIR চালুর মূল লক্ষ্য হলো—
অবৈধ ও ক্লোন হ্যান্ডসেট শনাক্ত করা
এনআইডির বিপরীতে সিম ব্যবহারে স্বচ্ছতা আনা
মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল অপরাধ প্রতিরোধে সহায়তা করা
এই কারণে NEIR সিস্টেমকে সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো হিসেবে দেখছে।
আরও জানতে পারেনঃ আজ থেকে NEIR চালু, আপনার মোবাইল ফোন বৈধ কি না জানবেন যেভাবে
এনআইডিতে অতিরিক্ত সিম বা হ্যান্ডসেট কেন দেখাচ্ছে
হিস্টোরিক ডেটা মাইগ্রেশনের প্রভাব
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, মোবাইল অপারেটরদের কাছ থেকে প্রায় তিন বিলিয়নের বেশি ডেটাসেট সংগ্রহ করা হয়েছে। এই ডেটার মধ্যে বর্তমান তথ্যের পাশাপাশি পুরোনো বা হিস্টোরিক ডেটাও রয়েছে। সিস্টেমে এই বিশাল ডেটা মাইগ্রেশনের সময় একটি বিষয় ঘটেছে—মাইগ্রেশনের তারিখ বর্তমান হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
এর ফলে আগে যেসব সিম বা হ্যান্ডসেট কখনো কোনো এনআইডির সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেগুলোকেও এখন সচল হিসেবে দেখাচ্ছে। বাস্তবে সেগুলোর অনেকগুলো আর ব্যবহারেই নেই।
আগের নিয়ম অনুযায়ী বেশি সিম ব্যবহারের ইতিহাস
এক সময় বাংলাদেশে একজন ব্যক্তি একটি এনআইডির বিপরীতে ২০টি পর্যন্ত সিম ব্যবহার করতে পারতেন। পরে সেটি ১৫টিতে নামানো হয়। বর্তমানে সেই সংখ্যা ১০টিতে নামিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। ফলে পুরোনো নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহৃত সিম ও ডিভাইসের হিস্টোরিক তথ্য এখন একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে। এতে এনআইডিতে অতিরিক্ত সিম দেখানো স্বাভাবিক বলেই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অবৈধ বা ক্লোন হ্যান্ডসেট কি এখনই বন্ধ হবে
৯০ দিনের নিশ্চয়তা
অনেকের বড় ভয় ছিল, হঠাৎ করে তাদের ব্যবহৃত ফোন বা সিম বন্ধ হয়ে যাবে কি না। এ বিষয়ে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, NEIR কার্যক্রম শুরু হলেও আগামী ৯০ দিনের মধ্যে কোনো অবৈধ বা ক্লোন করা হ্যান্ডসেট বন্ধ করা হবে না। তাই এই মুহূর্তে ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
এই সময়ের মধ্যে সিস্টেমের ত্রুটি চিহ্নিত করা, ডেটা পরিষ্কার করা এবং ব্যবহারকারীদের সচেতন করার কাজ চলবে।
বিটিআরসি ও অপারেটরদের যৌথ উদ্যোগ
এনআইডিতে অতিরিক্ত সিম দেখানোর সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন এবং মোবাইল অপারেটররা একসঙ্গে কাজ করছে। ধাপে ধাপে হিস্টোরিক ডেটা আর্কাইভ করা হবে এবং ভবিষ্যতে শুধু বর্তমানে সচল সিম ও হ্যান্ডসেটের তথ্যই দেখানো হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি ব্যাকগ্রাউন্ডে চলবে, যাতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য সিস্টেম ব্যবহার সহজ ও স্বচ্ছ থাকে।
VAPT ও সিস্টেম নিরাপত্তা
নতুন করে নিরাপত্তা পরীক্ষা কেন
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, আগে VAPT বা Vulnerability Assessment and Penetration Testing করা হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আবারও নতুন করে VAPT করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো—
ডেটাবেজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা
অননুমোদিত অ্যাক্সেস বন্ধ করা
নাগরিক তথ্য সুরক্ষিত রাখা
তিনি আরও বলেন, এই সিস্টেম নতুন নয়। ২০২১ সালে এটি প্রথম চালুর চেষ্টা হয়েছিল। এবার কিছু ফাংশনাল ফিচার বাড়িয়ে নতুনভাবে সচল করা হয়েছে।
আরও জানতে পারেনঃ গণভোট কী: বাংলাদেশ ও বিশ্ব প্রেক্ষাপটে গণভোটের গুরুত্ব ও বাস্তবতা
ডেটা সুরক্ষায় কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে
বর্তমানে ডেটাবেজ নিরাপদ রাখতে একাধিক স্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
Secure Digital Token JWT ব্যবহার
API রেট লিমিট
এনআইডি ভিত্তিক IMEI রেসপন্স সিস্টেম
১০, ১৩ ও ১৭ ডিজিট এনআইডির আলাদা ম্যাপিং
এছাড়া আরও একটি নিরাপত্তা স্তর যোগ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে, যাতে শুধুমাত্র অনুমোদিত ক্ষেত্রেই তথ্য দেখা যায়।
নাগরিক সচেতনতা কেন জরুরি
এনআইডিতে অতিরিক্ত সিম দেখানোর বিষয়টি শুধু একটি টেকনিক্যাল সমস্যা নয়, এটি নাগরিক সচেতনতার বিষয়ও। এর মাধ্যমে একজন ব্যক্তি জানতে পারবেন—
তার এনআইডির বিপরীতে কতটি সিম নিবন্ধিত
কোন সিমের বিপরীতে কোন ডিভাইস ব্যবহার হয়েছে
কোনো আর্থিক অপরাধে তার তথ্য ব্যবহৃত হচ্ছে কি না
এই তথ্য জানা একজন নাগরিকের অধিকার, বিশেষ করে মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন জুয়া–সংক্রান্ত অপরাধের ঝুঁকি বিবেচনায়।
শেষ কথা
এনআইডিতে অতিরিক্ত সিম বা হ্যান্ডসেট দেখানোর বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার আগে এর পেছনের বাস্তব কারণ জানা জরুরি। এটি কোনো ব্যক্তিগত ভুল বা নতুন ঝুঁকি নয়, বরং NEIR সিস্টেমে বিশাল ডেটা মাইগ্রেশনের একটি সাময়িক প্রভাব। সরকার, বিটিআরসি ও মোবাইল অপারেটররা যৌথভাবে সমস্যার সমাধানে কাজ করছে। নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো সচেতন থাকা, গুজবে কান না দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে সঠিক তথ্য যাচাই করা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সিস্টেম আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ হবে বলে আশা করা যায়।


