মুরগির কোন কোন জাত রয়েছে ২০২৬ সালে

টিকটিকির মতো ছোট্ট একটা ছানা কিনে এনে লালন-পালন করলেন। মাস খানেক পর দেখলেন, ওটা যে মুরগি হবে, সেটা নিশ্চিত। কিন্তু কোন জাতের মুরগি? ডিম দেবে, নাকি মাংসের জন্য বড় হবে? এ নিয়ে ভাবনা তখনই শুরু হয়। বন্ধুরা বলে, “দেশি মুরগি ভালো।” আরেকজন বলে, “লেয়ার জাত নিলে ডিম পাবি।” এই দ্বিধা কমবেশি সবারই হয়। মুরগির কোন কোন জাত রয়েছে, সেটা জানলে কিন্তু অনেক ভুল বাছাই থেকে রেহাই পাওয়া যায়। কারণ, আপনি ডিমের আশায় ব্রয়লার জাত কিনলে, মাস খানেকের মাথায় হতাশ হতে হবে। অথবা মাংসের আশায় লেগহর্ন কিনলে, সারাজীবন হাড়গোড় নিয়েই কাটবে। তাই জাত চেনাটা শুধু শখ নয়, বাস্তবিক প্রয়োজন।

সোজা কথায়, মুরগির জাতগুলোকে চার ভাগে ভাগ করা হয়: যারা শুধু ডিম দেয়, যারা শুধু মাংস দেয়, যারা দুটোই দেয়, আর যারা শো-পিস। আশ্চর্যের বিষয়, আমাদের দেশে অনেকেই এই ভাগগুলো না জেনেই খামার শুরু করে ফেলে। ফলে লোকসান তো হয়ই, সাথে মুরগির কষ্টও বাড়ে। এখন আসুন, সত্যিকারের গল্পটা জেনে নিই।

ডিম উৎপাদনকারী জাত

এই জাতের মুরগির জন্মগত বৈশিষ্ট্য হলো ডিম পাড়া। এরা মাংসের জন্য খুব একটা ভালো নয়। এদের শরীর চিকন, হালকা, আর বাচ্চা দেয়ার পরপরই ডিম পাড়া শুরু করে।

  • লেগহর্ন (Leghorn): ইতালি থেকে আসা এই মুরগি বিশ্বজুড়ে ডিমের জন্য পরিচিত। এরা বছরে ২৮০-৩০০ সাদা ডিম পাড়ে। সাধারণত বাণিজ্যিক খামারে এদের বেশি দেখা যায়। এদের চেহারা ফরসা, সাদা পালক, আর লাল ঝুঁটি।
  • মাইনরকা (Minorca): স্পেনের এই মুরগি আকারে একটু বড়। ডিমগুলোও বড় হয়, তবে সংখ্যায় লেগহর্নের চেয়ে কম। এরা সাদা ডিম দেয়।

সাধারণত এক্ষেত্রে যা হয়, কৃষকরা লেগহর্নকেই পছন্দ করেন কারণ এরা বেঁচে থাকার হার বেশি। কিন্তু খেয়াল রাখা দরকার, এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একটু কম। তাই ভালো খাবার আর পরিষ্কার পরিবেশ প্রয়োজন।

মাংস উৎপাদনকারী জাত (Broiler/Meat)

মুরগির কোন কোন জাত রয়েছে, জানতে চাইলে মাংসের জাত বাদ দিলে হবে না। এদের বড় করে তোলাই মুখ্য উদ্দেশ্য। মাত্র ৩৫-৪০ দিনে এরা জবাইয়ের উপযোগী হয়।

  • ব্রাহমা (Brahma): এই এশিয়ান জাতটি দেখতে দারুণ। পায়ে লোম, শরীরে ভারী। ডিমও দেয়, কিন্তু মাংসের জন্যই এদের বেশি ডাক। এরা আকারে বিশাল হয়।
  • কর্নিশ (Cornish): ইংল্যান্ডের এই জাতটি ব্রয়লার শিল্পের ভিত্তি। এদের শরীর পেশিতে ভরপুর। বর্তমানে বাজারে যে ব্রয়লার মুরগি পাওয়া যায়, সেগুলো বেশিরভাগই কর্নিশ ও প্লাইমাথ রকের মিশ্রণ।

শীতপ্রধান দেশের এই জাতগুলো আমাদের দেশের গরমে একটু কষ্ট পায়। তবে উন্নত হাইব্রিড জাতগুলো এখন গরম সহনশীল। তবে এদের লালন-পালনে খরচ বেশি, কিন্তু লাভও বেশি।

দ্বৈত উদ্দেশ্য জাত (Dual Purpose)

বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবারের জন্য এই জাতগুলো স্বর্গীয় উপহার। একই মুরগি ডিম দেবে, আবার বড় হয়ে মাংসও দেবে। মুরগির কোন কোন জাত রয়েছে, তার মধ্যে এই দ্বৈত উদ্দেশ্য জাতগুলোই সবচেয়ে ব্যবহারিক।

  • রোড আইল্যান্ড রেড (Rhode Island Red): আমেরিকা থেকে আসা এই মুরগির রং গাঢ় লাল। বাদামি ডিম পাড়ে, বছরে ২০০-২৫০টি। মাংসেও দারুণ। এদের স্বভাব শান্ত।
  • নিউ হ্যাম্পশায়ার (New Hampshire): রোড আইল্যান্ড রেডের উন্নত সংস্করণ। এরা একটু বেশি বড় হয়, ডিম দেয় ২০০-২২০টি। লাল-বাদামি রঙের হয়।
  • প্লাইমাথ রক (Plymouth Rock): ডোরাকাটা পালকের জন্য সহজেই চেনা যায়। সাদা-কালো ডোরাকাটা শরীর। এই মুরগি সুন্দর ও উপকারী – ডিম দেয়, মাংসেও মান সমান।

লক্ষণীয় যে, এই জাতগুলো অনেক পোষ্য প্রাণীর মতো কৌতূহলী। এদের বুদ্ধি বেশি, তাই সহজেই হাত বুলিয়ে নেওয়া যায়। যদি আপনার বাড়িতে ছোট ছেলে-মেয়ে থাকে, তাহলে এই জাতগুলো নিরাপদ।

দেশি জাত ও স্থানীয় প্রজাতি

আমাদের দেশের মুরগি। ছোট, কিন্তু স্বাদে অতুলনীয়। এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। তবে উৎপাদন কম।

  • দেশি মুরগি: সাদামাটা চেহারা, বাদামি ও কালো রঙের মিশ্রণ। বছরে ৬০-৮০টি ছোট ডিম দেয়। কিন্তু বাচ্চা ফোটানোর ক্ষমতা ভালো। বাজারে এর চাহিদা প্রচুর।
  • আসিল (Aseel): দেখতে হাড়-জিরিজিরি কিন্তু খুব শক্ত। মূলত লড়াইয়ের মুরগি হলেও মাংসের জন্যও পালন হয়। এদের মাংস শক্ত কিন্তু স্বাদে অতুলনীয়।

আশ্চর্যের বিষয়, অনেক উন্নত জাতের চেয়েও দেশি মুরগির বাচ্চা বাঁচার হার বেশি। তাই আপনি যদি একেবারে নবাগত হন, তাহলে দেশি মুরগি দিয়ে শুরু করতে পারেন। এদের কোনও স্পেশাল খাবারের দরকার নেই, যা আপনার বাড়ির উঠোনে আছে তাই চলে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাত নির্বাচন

বাংলাদেশ আবহাওয়া গরম ও আর্দ্র। তাই মুরগির কোন কোন জাত রয়েছে, তার মধ্যে থেকে আপনার এলাকার উপযোগী জাত বেছে নেওয়া জরুরি। বড় জাতগুলো (ব্রাহমা) গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

সরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের জন্য লেয়ার জাতের মধ্যে লেগহর্ন (হাইব্রিড) এবং দ্বৈত উদ্দেশ্য জাতের মধ্যে রোড আইল্যান্ড রেড বা দেশি মুরগির উন্নত সংকর বেশ ভালো সাড়া দিয়েছে।

সাধারণত এক্ষেত্রে যা হয়, আমাদের দেশের কৃষক প্রতিষ্ঠিত খামার থেকে বাচ্চা কিনে নেয়। কিন্তু উচিত হলো, স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে পরামর্শ নেওয়া। তারা আপনার এলাকার আবহাওয়া ও বাজারের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে জাত বাতে দিতে পারে।

FAQ: মুরগির জাত নিয়ে আপনার প্রশ্ন

  1. দেশি মুরগি ও হাইব্রিড মুরগির মধ্যে কোনটি লাভজনক?
    উত্তর: এটি আপনার চাহিদার ওপর নির্ভর করে। বাণিজ্যিক খামারে হাইব্রিড বেশি লাভ দেয় (ডিম ও মাংস উভয়ই)। কিন্তু দেশি মুরগির মাংসের বাজারমূল্য বেশি, এবং এদের রোগ কম হয়। দীর্ঘমেয়াদি পালনে দেশি মুরগি টেকসই।
  2. মুরগির কোন কোন জাত রয়েছে যা শিশুদের জন্য নিরাপদ?
    উত্তর: প্লাইমাথ রক ও রোড আইল্যান্ড রেড খুব শান্ত। এরা মানুষের সাথে মিশতে পছন্দ করে। লেগহর্ন বা ব্রয়লার খানিকটা চঞ্চল, তাই শিশুদের জন্য একটু সতর্ক থাকা দরকার।
  3. বাংলাদেশে কি ফ্রি-রেঞ্জ (মুক্ত পালন) জাত পাওয়া যায়?
    উত্তর: হ্যাঁ। দেশি মুরগি এবং নিউ হ্যাম্পশায়ার ফ্রি-রেঞ্জের জন্য উপযুক্ত। এরা নিজেরা খাবার খুঁজে নেয় এবং তেমন রোগাক্রান্ত হয় না।
  4. কোন জাতের মুরগি সবচেয়ে কম খাবার খেয়ে বেশি ডিম দেয়?
    উত্তর: লেগহর্ন এই ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়ন। তাদের খাদ্য-ডিম রূপান্তর হার (FCR) সবচেয়ে ভালো। প্রতি ১ কেজি খাবারের জন্য তারা প্রায় ২.২ কেজি ডিম উৎপাদন করে।
  5. মুরগি পালনে সবচেয়ে বড় ভুল কী?
    উত্তর: আপনার বাড়ির উঠোনে সব জাত একসঙ্গে মেশানো। প্রতিটি জাতের আলাদা তাপমাত্রা, খাবার ও জায়গার চাহিদা আছে। যেমন ব্রয়লারকে আলাদা বাড়িতে রাখা ভালো, নয়তো তারা শান্ত লেয়ার জাতকে ঠেলে দেবে।
  6. কি দেশি মুরগি দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ডিম উৎপাদন করা যায়?
    উত্তর: তেমন লাভজনক নয়। দেশি মুরগির ডিম উৎপাদন কম (প্রতি বছর ৬০-৮০টি) এবং ডিম ছোট হয়। তবে উচ্চমূল্যের নিশ বা বাটার ডিমের বাজারে টার্গেট করলে দেশি মুরগি ভালো লাভ দিতে পারে।

আপনি কী করবেন?

মুরগির কোন কোন জাত রয়েছে, সেটা জানা মানে অর্ধেক যুদ্ধ জিতে ফেলা। এখন বাকি অর্ধেক নির্ভর করে আপনার উদ্দেশ্যের ওপর। আপনি কী চান? শখ করে পালবেন, নাকি আয়ের উৎস বানাবেন? নাকি শুধু পরিবারের জন্য পুষ্টি যোগাবেন? যদি টাকার কথা ভাবেন, তবে স্থানীয় বাজার পরীক্ষা করুন। এই এলাকায় দেশি মুরগির ডিমের দাম কেমন? নাকি ব্রয়লারের মাংসের চাহিদা বেশি? এই হিসাব না করলে সঠিক জাত বেছে নেওয়া সম্ভব নয়। সবশেষে, মনে রাখবেন মুরগি পালন শুধু ব্যবসা নয়, এটি জীবনযাপনের একটা অংশ। সঠিক জাত বেছে নিলে আপনার উঠোন প্রাণবন্ত হবেই, সাথে পকেটও ভারী হবে। কিন্তু ভুল জাত আপনাকে হতাশ করবে। তাই আর দেরি না করে, আজই স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অফিসে ফোন করুন।

Scroll to Top