এম এল এস এস (MLSS) পদের কাজ কি? | অফিস সহায়কের দায়িত্ব ও বেতন

আপনি যদি সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন বা সম্প্রতি ‘এম এল এস এস’ বা ‘অফিস সহায়ক’ পদে একটি চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে থাকেন, তাহলে আপনার মনের ভেতরে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: এম এল এস এস (MLSS) পদের কাজ কি? আসলে, এম এল এস এস (Member of Lower Subordinate Staff) বা অফিস সহায়ক পদের প্রধান কাজ হলো সরকারি অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৈনন্দিন কাজে সহায়তা করা। এর মধ্যে রয়েছে ফাইল ও নথিপত্র এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় স্থানান্তর, অফিসের আসবাবপত্র গোছানো, চা-নাশতা পরিবেশন এবং চিঠিপত্র বিতরণের মতো সহায়ক কাজ। নতুন পে স্কেল ২০২৬ তালিকা কার্যকর হলে এই পদের বেতন কাঠামোতেও পরিবর্তন আসবে, যা এই পদের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দেবে।

Summary of Article

এম এল এস এস (MLSS) আসলে কী? পূর্ণ রূপ ও ইতিহাস

এম এল এস এস বা MLSS-এর পূর্ণ রূপ হলো Member of Lower Subordinate Staff। বাংলায় এর অর্থ ‘নিম্ন অধস্তন কর্মচারী সদস্য’। এটি বাংলাদেশ সরকারের চতুর্থ শ্রেণির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ। এই ব্যাপারটা অনেকেই জানেন না যে, ব্রিটিশ আমল থেকেই সরকারি অফিসে পিয়ন, দফতরি, চাপরাশি, আর্দালি— এমনি নানান নামে এই পদটি পরিচিত ছিল।

২০১৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি পরিপত্রের মাধ্যমে চতুর্থ শ্রেণির ৩৪টি পদের নাম পরিবর্তন করে ‘অফিস সহায়ক’ নামে একটি একক পদ তৈরি করা হয়। তাই বর্তমানে আপনি যদি কোনও সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে ‘অফিস সহায়ক’ পদ দেখেন, জেনে রাখবেন সেটিই আগের এমএলএসএস পদ। এই পদটি চতুর্থ শ্রেণি হলেও, এটি সরকারি প্রশাসনের রক্ত তৈরি করে।

এম এল এস এস / অফিস সহায়ক পদের কাজ কী কী?

অফিসের ভেতরে সহায়তামূলক কাজ

মূল কাজের শুরু হয় অফিস খোলার আগে থেকে। অফিসের আসবাবপত্র, ফাইল এবং রেকর্ড সুন্দরভাবে বিন্যস্ত করা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। ফাইল ও কাগজপত্র নির্দেশ অনুযায়ী এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাওয়া। সত্যি বলতে, আপনি যদি একটি মন্ত্রণালয়ের কথা ভাবেন, তাহলে প্রতিদিন হাজার হাজার ফাইল একটেবিল থেকে আরেকটেবিলে যায়—এ কাজটাই অফিস সহায়করা করে থাকেন।

কর্মকর্তাদের সহায়তা

এটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো কাজ। কর্মকর্তাদের জন্য চা, নাশতা ও পানীয় পরিবেশন করা। অনেক নতুন কর্মচারী এই কাজটিকে ‘ছোট’ মনে করেন, কিন্তু বাস্তবে এটি একটি অফিসের নিত্য প্রয়োজনীয় কাজ। এছাড়াও, কর্মকর্তার নির্দেশে চিঠিপত্র, নথি ও ফাইল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেওয়া, এবং প্রায়শই ব্যাংক বা অন্য দপ্তরে যাওয়ার মতো কাজও করতে হয়।

অফিস রক্ষণাবেক্ষণ ও যোগাযোগ কাজ

অফিস বন্ধের পর কক্ষ গোছানো ও পরিষ্কার রাখা। অফিসের পতাকা উত্তোলন ও নামানো (যেখানে প্রয়োজন) এই পদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আর যোগাযোগের কাজে অফিসের ভিতরে ও বাইরে বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং সরকারি ডাক ও রেজিস্ট্রি সামগ্রী সংগ্রহ ও বিতরণ করা হয়।

গুরুত্বপূর্ণ: অফিস সহায়ককে শুধুমাত্র অফিস-সংক্রান্ত কাজই করতে হবে। ঝাড়ুদারের কাজ বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতে বাধ্য করা যাবে না। এটি ১৯৬৯ সালের একটি সরকারি পরিপত্র দ্বারা নিশ্চিত করা হয়েছে।

এম এল এস এস পদের মূল তথ্য এক নজরে

বিষয়তথ্য
পদের আনুষ্ঠানিক নামঅফিস সহায়ক (Office Sahayak)
পদের পুরনো নামএমএলএসএস, পিয়ন, চাপরাশি, দফতরি
MLSS পূর্ণ রূপMember of Lower Subordinate Staff
চাকরির শ্রেণিচতুর্থ শ্রেণি (২০তম গ্রেড)
মূল বেতন (জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫)৮,২৫০ – ২০,০১০ টাকা
ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতাএসএসসি বা সমমান
কর্মঘণ্টা৮ ঘণ্টা (সরকারি অফিস সময়)
পদোন্নতিঅফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে

এম এল এস এস পদের বেতন কত?

আসলে, এমএলএসএস বা অফিস সহায়ক পদটি ২০তম গ্রেডের চাকরি। জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী মূল বেতন শুরু হয় ৮,২৫০ টাকা থেকে এবং সর্বোচ্চ ২০,০১০ টাকা পর্যন্ত যেতে পারে। সব ভাতা (বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা) যোগ করলে মাসিক সাকুল্য বেতন দাঁড়ায় গড়ে ১৪,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকার মতো।

এছাড়া, পেনশন, ঈদ বোনাস এবং ওভারটাইম ভাতার মতো সুবিধাও রয়েছে। তবে মনে রাখবেন, নতুন পে স্কেল ২০২৬ তালিকা কার্যকর হলে, ২০২৬ সালের জুলাই থেকে বেতন কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। বাস্তব উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, একজন অফিস সহায়ক বর্তমানে তার পরিবারকে মোটামুটি ভালোভাবে চালাতে পারেন, কারণ সরকারি চাকরির নিরাপত্তা এবং নিয়মিত আয়ের সুবিধা এটিকে একটি নির্ভরযোগ্য পেশা করে তোলে।

এম এল এস এস / অফিস সহায়ক পদে নিয়োগের যোগ্যতা কী কী?

শিক্ষাগত যোগ্যতা

যে কোনো স্বীকৃত বোর্ড থেকে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (SSC) বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

বয়সসীমা

সাধারণত ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত আবেদন করা যায়। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কোটা বিভাগের (মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী) জন্য বয়স শিথিলযোগ্য।

শারীরিক ও পরীক্ষার ধরন

সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। লিখিত পরীক্ষায় সাধারণত অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং সাধারণ জ্ঞান (বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক) থেকে প্রশ্ন করা হয়। একটি মজার তথ্য হলো, এই পরীক্ষার মান তেমন কঠিন নয়, তবে প্রতিযোগিতা প্রচণ্ড। গত বছর আমার এক পরিচিত ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি দপ্তরে অফিস সহায়ক পদের পরীক্ষা দিয়েছিল, যেখানে ৫০০০ এর বেশি আবেদনকারী ছিল মাত্র ১০টি পদের জন্য।

এম এল এস এস পদ থেকে পদোন্নতির সুযোগ আছে কি?

হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। অনেকেই মনে করেন এই পদে চাকরি করলে আর বড় কিছু হয় না, কিন্তু সেটি ভুল। পদোন্নতির মাধ্যমে আপনি ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আনতে পারেন।

  • পদোন্নতির ধাপ: অফিস সহায়ক (গ্রেড-২০) থেকে শুরু করে ৫-৭ বছর সন্তোষজনক কাজের পর আপনি অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক (গ্রেড-১৬) পদে উন্নীত হতে পারেন।
  • প্রয়োজনীয় শর্ত: কমপক্ষে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা, এইচএসসি বা সমমান পাস (কোথাও স্নাতকও প্রয়োজন), এবং কম্পিউটার টাইপিং দক্ষতা (বাংলা ও ইংরেজি) বাধ্যতামূলক।
  • টিপস: যদি পদোন্নতি পেতে চান, এখনই কম্পিউটার টাইপিং শেখা শুরু করুন। এটি আপনার জন্য স্বর্ণের চাবিকাঠি হবে।

এম এল এস এস পদে চাকরির সুবিধা-অসুবিধা

সুবিধাসমূহ

  • সরকারি চাকরির নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব
  • পেনশন ও অবসর সুবিধা
  • ঈদ বোনাস ও উৎসব ভাতা
  • চিকিৎসা ও বাড়ি ভাড়া ভাতা
  • পদোন্নতির মাধ্যমে ক্যারিয়ার গঠনের সুযোগ
  • কোথাও সরকারি আবাসন (কোয়ার্টার) পাওয়ার সম্ভাবনা

চ্যালেঞ্জসমূহ

  • শুরুতে বেতন তুলনামূলক কম (গড়ে ১৪ হাজার টাকা)
  • কখনো কখনো অফিসের বাইরের অনানুষ্ঠানিক কাজ করতে হতে পারে
  • উচ্চতর পদোন্নতির সুযোগ কিছুটা সীমিত
  • কাজের চাপ ও সময়ের প্রতি শৃঙ্খলা প্রয়োজন

সরকারি পিয়নের দায়িত্ব সংক্রান্ত পরিপত্র কী বলে?

একটু ভেবে দেখলে, এই পদের দায়িত্ব নিয়ে অনেকেরই বিভিন্ন ধারণা রয়েছে। কিন্তু সরকারি নিয়ম পরিষ্কার। ১৯৬৯ সালের ২৯ অক্টোবর জারি করা একটি পরিপত্রে (স্মারক নং সংখ্যা ১) বলা হয়েছে:

  • অফিসের আসবাবপত্র ও রেকর্ড বিন্যস্ত ও পরিষ্কার রাখা
  • ফাইল ও কাগজপত্র নির্দেশক্রমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাঠানো
  • হালকা আসবাবপত্র স্থানান্তর
  • অফিস চলাকালীন সার্বক্ষণিক উপস্থিত থাকা
  • কর্মকর্তার নির্দেশিত যেকোনো দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করা

এই পরিপত্রের মূল কথা হলো—অফিস কর্তৃপক্ষ দাপ্তরিক কাজ করাতে পারবেন, কিন্তু ঝাড়ুদার বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করতে বাধ্য করা যাবে না।

কোন কোন সরকারি প্রতিষ্ঠানে এম এল এস এস পদে নিয়োগ হয়?

বাংলাদেশের প্রায় সব ধরনের সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে এই পদটি রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • সরকারি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ
  • জেলা প্রশাসনের অধীনে দপ্তর
  • সরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়
  • এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
  • বাংলাদেশ ডাক বিভাগ
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
  • বিভিন্ন সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

এম এল এস এস পরীক্ষার প্রস্তুতি কীভাবে নেবেন?

ধাপ ১: বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা

  • বাংলা: ব্যাকরণ (সন্ধি, সমাস, বাগধারা), সাহিত্য
  • ইংরেজি: Grammar (Tense, Parts of Speech, Preposition)
  • গণিত: ভগ্নাংশ, শতকরা, ক্ষেত্রফল
  • সাধারণ জ্ঞান: বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, ভূগোল

ধাপ ২: বিগত বছরের প্রশ্ন সমাধান

বিগত বছরের প্রশ্নপত্র সমাধান করলে পরীক্ষার ধরণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা হয়। আমাদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, যারা বিগত প্রশ্ন নিয়মিত অনুশীলন করে তারা লিখিত পরীক্ষায় ২০% বেশি নম্বর পেয়েছে।

ধাপ ৩: মক টেস্ট ও শারীরিক প্রস্তুতি

প্রতিদিন অন্তত ১-২ ঘণ্টা পড়াশোনা এবং সপ্তাহে অন্তত একটি মক টেস্ট দিন। মৌখিক পরীক্ষার জন্য আত্মবিশ্বাস ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন উপস্থিতি জরুরি।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

এম এল এস এস এর পূর্ণ রূপ কী?

MLSS-এর পূর্ণ রূপ হলো Member of Lower Subordinate Staff। বাংলায় এর অর্থ ‘নিম্ন অধস্তন কর্মচারী সদস্য’। এটি বাংলাদেশ সরকারের চতুর্থ শ্রেণির একটি পদ।

এমএলএসএস এখন কোন নামে পরিচিত?

২০১৪ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি পরিপত্রের পর এমএলএসএস পদের নতুন নাম হয়েছে অফিস সহায়ক। বর্তমানে সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে দুটি নামই ব্যবহার করা হয়, তবে এরা একই পদ।

এম এল এস এস পদের বেতন কত?

জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী অফিস সহায়ক (এমএলএসএস) পদের মূল বেতন ৮,২৫০ থেকে ২০,০১০ টাকা (গ্রেড-২০)। সব ভাতাসহ মাসিক সাকুল্য বেতন গড়ে ১৪,০০০-১৫,০০০ টাকার মতো। নতুন পে স্কেল ২০২৬ তালিকা কার্যকর হলে এই বেতন আরও বাড়বে।

অফিস সহায়ক কততম গ্রেডের চাকরি?

অফিস সহায়ক বা এমএলএসএস পদটি ২০তম গ্রেড এবং চতুর্থ শ্রেণির সরকারি চাকরি। এটি বাংলাদেশ সরকারের সর্বনিম্ন গ্রেডের একটি পদ।

এমএলএসএস পদে নিয়োগের জন্য কী কী লাগে?

এসএসসি বা সমমান পাস, সুস্বাস্থ্য এবং নির্ধারিত বয়সসীমা (সাধারণত ১৮-৩০ বছর) পূরণ করতে হবে। কোটা বিভাগের জন্য বয়স শিথিলযোগ্য।

অফিস সহায়ক থেকে কি পদোন্নতি হয়?

হ্যাঁ, ৫-৭ বছর কাজ করার পর, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও কম্পিউটার দক্ষতা থাকলে অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক পদে (গ্রেড-১৬) পদোন্নতি পাওয়া সম্ভব। এটি অনেকের জন্য ক্যারিয়ারের একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট।

পিয়ন ও এমএলএসএস কি একই পদ?

হ্যাঁ, পিয়ন ও এমএলএসএস মূলত একই ধরনের পদ ছিল। ২০১৪ সালের পরিপত্রে উভয়কেই অফিস সহায়ক নামে একত্রিত করা হয়েছে। তাই এখন আর আলাদা করে পিয়ন পদ নেই।

Scroll to Top