যে সঞ্চয়পত্র সবাই কিনতে পারেন, তিন মাস পরপর মুনাফার টাকা তোলা যায় সেটি হলো তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত এই সঞ্চয়পত্রে তিন বছর মেয়াদ শেষে নির্ধারিত হারে মুনাফা পাওয়া যায়। পাশাপাশি প্রতি তিন মাসে মুনাফা তোলার সুযোগ থাকায় নিয়মিত নগদ অর্থ প্রয়োজন এমন বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি কার্যকর একটি বিকল্প।
পরিবার সঞ্চয়পত্র মূলত নির্দিষ্ট শ্রেণির নারীদের জন্য এবং পেনশনার সঞ্চয়পত্র অবসরভোগীদের জন্য প্রযোজ্য। বিপরীতে তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র সব শ্রেণি ও পেশার বাংলাদেশি নাগরিক কিনতে পারেন। তবে বিনিয়োগের সীমা, উৎসে কর, মেয়াদপূর্ব ভাঙানোর নিয়ম এবং যোগ্যতার শর্ত আগে বুঝে নেওয়া জরুরি। তাই কেনার আগে নিজের আর্থিক প্রয়োজনের সঙ্গে নিয়মগুলো মিলিয়ে দেখা উচিত।
- মূল্যমান: ১ লাখ, ২ লাখ, ৫ লাখ ও ১০ লাখ টাকা।
- মেয়াদ: ৩ বছর।
- মুনাফা: তিন মাস পরপর তোলার সুযোগ রয়েছে।
- তিন বছর শেষে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে হার ১১.৮২ শতাংশ এবং এর বেশি বিনিয়োগে হার ১১.৭৭ শতাংশ।
- ক্রয় ও নগদায়ন: জেলা সঞ্চয় অফিস, জাতীয় সঞ্চয় বিশেষ ব্যুরো, বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ডাকঘর।
নিচের হার ও করসংক্রান্ত তথ্য ২০২৬ সালের জন্য প্রকাশিত প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে সাজানো হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার বা প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন হতে পারে। তাই কেনার আগে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সরকারি তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্র থেকে সর্বশেষ তথ্য মিলিয়ে নিন।
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র কী
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র এমন একটি সঞ্চয়পত্র যেখানে বিনিয়োগকারী প্রতি তিন মাস পরপর মুনাফা তুলতে পারেন। এটি প্রায় ২৮ বছর আগে চালু করা হয়। তবে পরিবার সঞ্চয়পত্র বা পেনশনার সঞ্চয়পত্রের মতো নির্দিষ্ট পরিচয়ের শর্ত এখানে নেই। ফলে চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, পেশাজীবী এবং অন্যান্য বাংলাদেশি নাগরিক এই সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ পান।
সঞ্চয়পত্রটির মেয়াদ তিন বছর। কেউ যদি পুরো মেয়াদ ধরে রাখেন তবে নির্ধারিত পূর্ণ মেয়াদের মুনাফার হার প্রযোজ্য হয়। অন্যদিকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভাঙালে মুনাফার হার কমে যায়। আগে বেশি মুনাফা দেওয়া হয়ে থাকলে অতিরিক্ত অংশ মূল টাকা থেকে কেটে নেওয়ার নিয়মও রয়েছে। তাই জরুরি প্রয়োজনে ভাঙানোর সম্ভাবনা থাকলে শুরুতেই এই বিষয়টি হিসাবের মধ্যে রাখা দরকার।
লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো নিয়মিত মুনাফা পাওয়া এবং মূলধন ধরে রাখার প্রয়োজন—দুইটি বিষয় একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। মাসিক খরচের জন্য নগদ প্রবাহ দরকার হলে এটি উপযোগী হতে পারে। তবে জরুরি প্রয়োজনে খুব দ্রুত টাকা লাগতে পারে এমন ব্যক্তির পুরো সঞ্চয় এখানে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। এ কারণে সহজে উত্তোলনযোগ্য কিছু অর্থ আলাদা রাখাও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।
কারা এই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র সাধারণভাবে সব শ্রেণি ও পেশার বাংলাদেশি নাগরিক কিনতে পারেন। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠান ও তহবিলও এতে বিনিয়োগের যোগ্য। ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব ও বিনিয়োগসীমা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অনুমোদন, নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হতে পারে। তাই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় নথি এক নয়।
যোগ্য ক্রেতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রধান শ্রেণিগুলো হলো:
- সব শ্রেণি ও পেশার বাংলাদেশি নাগরিক।
- আয়কর বিধিমালা, ১৯৮৪-এর বিধি ৪৯-এর উপবিধি ২-এ সংজ্ঞায়িত স্বীকৃত ভবিষ্য তহবিল।
- ভবিষ্য তহবিল আইন, ১৯২৫ অনুযায়ী পরিচালিত ভবিষ্য তহবিল।
- মৎস্য খামার, হাঁস-মুরগির খামার, পেলিটেড পোলট্রি ফিডস উৎপাদন, বীজ উৎপাদন ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বীজ বিপণন থেকে আয় করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।
- গবাদিপশুর খামার, দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের খামার, ব্যাঙ উৎপাদন খামার, উদ্যান প্রকল্প, রেশম গুটিপোকা পালন, ছত্রাক উৎপাদন এবং ফল ও লতাপাতার চাষ থেকে আয় করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনারের প্রত্যয়ন প্রয়োজন হতে পারে।
- অটিস্টিক ব্যক্তিদের জন্য প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সহায়তা প্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগের মুনাফা অটিস্টিক ব্যক্তিদের সহায়তায় ব্যবহার করতে হবে এবং জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের প্রত্যয়নপত্র লাগবে।
- দুস্থ ও অনাথ শিশুদের নিবন্ধিত আশ্রয় প্রতিষ্ঠান যেমন অনাথ আশ্রম, শিশু পরিবার ও এতিমখানা।
- প্রবীণদের জন্য নিবন্ধিত আশ্রয়কেন্দ্র।
সাধারণ ভুল হলো যোগ্যতা থাকলেই প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র ছাড়াই আবেদন করা যায় মনে করা। বিশেষ শ্রেণির প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন সনদ, প্রত্যয়নপত্র বা আয়সংক্রান্ত কাগজ দেখাতে হতে পারে। তাই প্রতিষ্ঠান থেকে বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট জেলা সঞ্চয় অফিস বা ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে নথির তালিকা জেনে নেওয়া ভালো। এতে আবেদন জমা দেওয়ার পর কাগজের ঘাটতির কারণে বিলম্বের ঝুঁকি কমে।
মূল্যমান ও বিনিয়োগসীমা
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ১ লাখ, ২ লাখ, ৫ লাখ এবং ১০ লাখ টাকা মূল্যমানে পাওয়া যায়। একজন বিনিয়োগকারী প্রয়োজন অনুযায়ী একাধিক মূল্যমান মিলিয়ে কিনতে পারেন। তবে মূল্যমান বেছে নেওয়ার সময় শুধু মোট বিনিয়োগ নয়, তিন মাস পরপর সম্ভাব্য মুনাফা এবং জরুরি নগদ চাহিদাও বিবেচনায় রাখা উচিত। যেমন, ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময়ে টাকা লাগলে পুরো অর্থ একসঙ্গে বিনিয়োগ না করাই সুবিধাজনক হতে পারে।
| বিনিয়োগকারী | সর্বোচ্চ সীমা | প্রধান শর্ত |
|---|---|---|
| ব্যক্তি | একক নামে ৩০ লাখ টাকা | একজনের নামে বিনিয়োগ |
| যুগ্ম বিনিয়োগকারী | ৬০ লাখ টাকা | যুগ্ম নামে সঞ্চয়পত্র |
| প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্য তহবিল | মোট স্থিতির ৫০ শতাংশ | সর্বোচ্চ ৫০ কোটি টাকা |
| ফার্ম | সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা | প্রতিষ্ঠানের ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য |
| অটিস্টিক সহায়ক প্রতিষ্ঠান | সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা | সংশ্লিষ্ট প্রত্যয়ন প্রয়োজন |
| অনাথ শিশুদের আশ্রয় প্রতিষ্ঠান | সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা | নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান হতে হবে |
| প্রবীণ আশ্রয়কেন্দ্র | সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা | নিবন্ধিত আশ্রয়কেন্দ্র হতে হবে |
উদাহরণস্বরূপ, কেউ ১০ লাখ টাকার একটি সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন। আবার ১ লাখ ও ২ লাখ টাকার মূল্যমান মিলিয়েও বিনিয়োগ গঠন করা সম্ভব। তবে ব্যক্তির একক নামে মোট বিনিয়োগ ৩০ লাখ টাকা এবং যুগ্ম নামে ৬০ লাখ টাকার সীমা অতিক্রম করা যাবে না। অন্য সঞ্চয়পত্রে থাকা বিনিয়োগ এই সীমার হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে কি না, তা কেনার সময় বিক্রয়কেন্দ্র থেকে নিশ্চিত করুন।
বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে একটি সহজ নিয়ম কাজে লাগে: তিন বছরের আগে টাকার প্রয়োজন হতে পারে মনে হলে পুরো সঞ্চয় একসঙ্গে বিনিয়োগ না করে কিছু অর্থ সহজে উত্তোলনযোগ্য জায়গায় রাখা ভালো। ফলে মেয়াদপূর্ব ভাঙানোর কারণে মুনাফা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা কমে।
মুনাফার হার ও করের হিসাব
তিন বছর মেয়াদ পূর্ণ করলে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের জন্য মুনাফার হার ১১.৮২ শতাংশ। ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পূর্ণ মেয়াদ শেষে মুনাফার হার ১১.৭৭ শতাংশ। তবে মেয়াদের আগে সঞ্চয়পত্র ভাঙালে নির্ধারিত পূর্ণ মেয়াদের হার পাওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কম হারে মুনাফা গণনা হবে।
মুনাফার ওপর অগ্রিম কর কেটে রাখা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী আয়কর আইন-২০২৩-এর ১০৫ ধারার অধীনে টিআইএন থাকলে মুনাফার ১০ শতাংশ এবং টিআইএন না থাকলে ১৫ শতাংশ অগ্রিম কর কাটা হবে। ২০২৬ সালে এই কেটে রাখা কর আয়কর রিটার্ন জমার সময় সমন্বয় করার সুযোগ রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তাই হাতে পাওয়া অর্থ হিসাব করার সময় করের বিষয়টি বাদ দেওয়া যাবে না।
| বিনিয়োগের অবস্থা | মেয়াদ শেষে হার | করসংক্রান্ত বিষয় |
|---|---|---|
| ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত | ১১.৮২ শতাংশ | টিআইএন থাকলে ১০ শতাংশ এবং না থাকলে ১৫ শতাংশ অগ্রিম কর |
| ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি | ১১.৭৭ শতাংশ | টিআইএনভেদে একই উৎসে করের নিয়ম প্রযোজ্য |
| মেয়াদের আগে ভাঙানো | কম হার প্রযোজ্য | আগে বেশি দেওয়া মুনাফা মূলধন থেকে কাটা যেতে পারে |
এখানে শতাংশের হারকে সরাসরি হাতে পাওয়া টাকা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ উৎসে কর কাটার পর প্রাপ্ত অর্থ কম হবে। আবার মেয়াদপূর্তির আগেই নগদায়ন করলে মুনাফার হার কমে যেতে পারে। তাই বিনিয়োগের আগে বিক্রয়কেন্দ্র থেকে নির্দিষ্ট মূল্যমানের জন্য তিন মাস অন্তর সম্ভাব্য নিট মুনাফা লিখিতভাবে জেনে নেওয়া নিরাপদ।
সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কেটে রাখা অর্থ এখন চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য না হয়ে রিটার্ন জমার সময় সমন্বয়যোগ্য হতে পারে। তবে ব্যক্তির নিজস্ব কর পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। এজন্য প্রয়োজনে নিবন্ধিত কর পরামর্শকের সহায়তা নিন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করুন।
কোথায় কিনবেন ও কীভাবে ভাঙাবেন
জেলা সঞ্চয় অফিস, জাতীয় সঞ্চয় বিশেষ ব্যুরো, বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ডাকঘর থেকে এই সঞ্চয়পত্র কেনা যায়। একই ধরনের নির্ধারিত কেন্দ্র থেকে মেয়াদ শেষে বা নিয়ম মেনে মেয়াদের আগেও নগদায়ন করা যায়। আবেদন করার সময় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, নমিনি তথ্য এবং টিআইএনসংক্রান্ত কাগজ প্রয়োজন হতে পারে। তবে নথির নির্দিষ্ট তালিকা প্রতিষ্ঠানভেদে বদলাতে পারে।
- প্রথমে বিনিয়োগসীমা ও যোগ্যতা যাচাই করুন।
- এরপর সঞ্চয় অফিস, ব্যাংক বা ডাকঘরে মূল্যমান ও মুনাফার সর্বশেষ হার জেনে নিন।
- জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাবের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় করসংক্রান্ত কাগজ প্রস্তুত রাখুন।
- নমিনির নাম, সম্পর্ক ও পরিচয়পত্রের তথ্য নির্ভুলভাবে দিন।
- মুনাফা কোন হিসাবে যাবে এবং তিন মাসের তারিখ কীভাবে গণনা হবে, তা নিশ্চিত করুন।
- সবশেষে রসিদ, সঞ্চয়পত্রের কাগজ এবং নমিনি-সংক্রান্ত নথি নিরাপদে সংরক্ষণ করুন।
মেয়াদের আগে ভাঙানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্ভাব্য কর্তন। নির্ধারিত নিয়মের চেয়ে বেশি মুনাফা আগে পরিশোধ হয়ে থাকলে সেই অতিরিক্ত অর্থ মূল টাকা থেকে কেটে রাখা হতে পারে। তাই জরুরি প্রয়োজনে ভাঙানোর আগে কেন্দ্র থেকে লিখিত হিসাব বা প্রাপ্য অর্থের বিবরণ চাওয়া উচিত।
শহরে বসবাসকারী একজন বিনিয়োগকারী কাছের ব্যাংক শাখায় কিনতে পারেন। আবার জেলা শহরের বাইরে থাকা ব্যক্তি ডাকঘর বা জেলা সঞ্চয় অফিস ব্যবহার করতে পারেন। তবে কেন্দ্র বেছে নেওয়ার সময় শুধু দূরত্ব নয়, মুনাফা জমার হিসাব, নগদায়নের প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় নথি যাচাইয়ের সুবিধাও বিবেচনায় রাখুন।
নমিনি ও পুনঃবিনিয়োগের সুবিধা
ক্রেতা নমিনি নিয়োগ করতে পারেন। সঞ্চয়পত্রের মালিক মারা গেলে নমিনি সঙ্গে সঙ্গে সঞ্চয়পত্র নগদায়ন করে অর্থ তুলতে পারেন। বিকল্প হিসেবে নমিনি মেয়াদ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র চালু রেখে প্রতি তিন মাস অন্তর মুনাফা তুলতে পারেন। তাই পরিবারের আর্থিক পরিকল্পনায় এই দুই বিকল্পের পার্থক্য আগে বোঝা দরকার।
মালিকের মৃত্যুর পর পরিবারের তাৎক্ষণিক অর্থের প্রয়োজন থাকলে নগদায়ন সুবিধা কার্যকর হতে পারে। বিপরীতে নিয়মিত মুনাফা চালু রাখতে চাইলে মেয়াদ পর্যন্ত ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। তবে নমিনির পরিচয় ও যোগাযোগের তথ্য ভুল হলে প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই সঞ্চয়পত্র কেনার সময় তথ্য যাচাই করে দেওয়া এবং পরে পরিবর্তন হলে সংশ্লিষ্ট অফিসকে জানানো ভালো।
মেয়াদপূর্তির আগে ইস্যু অফিসে যোগাযোগ করলে স্বয়ংক্রিয় পুনঃবিনিয়োগের সুবিধাও পাওয়া যায়। অর্থাৎ বিনিয়োগকারী চাইলে মেয়াদ শেষে অর্থ তুলে না নিয়ে নিয়ম অনুযায়ী আবার বিনিয়োগ চালু রাখতে পারেন। তবে পুনঃবিনিয়োগের সময়কার মুনাফার হার ও সরকারি শর্ত পুরোনো হারের মতো নাও হতে পারে। তাই সেদিনের প্রযোজ্য নিয়ম অবশ্যই যাচাই করতে হবে।
কাদের জন্য উপযোগী এবং কী ভুল এড়াবেন
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র তাঁদের জন্য তুলনামূলকভাবে উপযোগী, যাঁদের নিয়মিত ব্যবধানে মুনাফার অর্থ প্রয়োজন এবং যাঁরা তিন বছর পর্যন্ত মূলধন ধরে রাখতে পারেন। অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, পারিবারিক ব্যয় পরিচালনাকারী বিনিয়োগকারী বা স্থির নগদ প্রবাহ চান এমন ব্যক্তি বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। তবে কোনো বিনিয়োগকেই ঝুঁকিমুক্ত ধরে পুরো অর্থ এক জায়গায় রাখা উচিত নয়।
সাধারণ ভুলগুলো
- মেয়াদের আগে ভাঙালে পূর্ণ ১১.৮২ শতাংশ বা ১১.৭৭ শতাংশ পাওয়া যাবে ধরে নেওয়া।
- উৎসে কর কাটার পর হাতে পাওয়া অর্থ হিসাব না করা।
- একক, যুগ্ম বা প্রতিষ্ঠানভেদে বিনিয়োগসীমা না মেনে আবেদন করা।
- নমিনির নাম ও পরিচয়পত্রের তথ্য অসম্পূর্ণ রাখা।
- সঞ্চয়পত্রের রসিদ এবং মুনাফা জমার নথি সংরক্ষণ না করা।
- পুরোনো মুনাফার হারকে ২০২৬ সালের বর্তমান হার ধরে নেওয়া।
ধরা যাক, কোনো পরিবারের আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা বা শিক্ষার খরচ আছে। সেই অর্থ পুরোপুরি তিন বছরের সঞ্চয়পত্রে রাখা উপযুক্ত নাও হতে পারে। কারণ প্রয়োজনের সময় ভাঙালে মুনাফা কমার পাশাপাশি আগে দেওয়া অতিরিক্ত অর্থ মূলধন থেকে সমন্বয় হতে পারে। তাই সিদ্ধান্তের আগে সময়সীমা, নগদ চাহিদা এবং কর-পরবর্তী আয়—এই তিনটি বিষয় পাশাপাশি দেখুন।
প্রশ্নোত্তর
তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র সবাই কিনতে পারেন?
সব শ্রেণি ও পেশার বাংলাদেশি নাগরিক এটি কিনতে পারেন। তবে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা বিনিয়োগসীমা এবং বিশেষ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রত্যয়নপত্রের শর্ত থাকতে পারে।
এই সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ কত?
মেয়াদ তিন বছর। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নগদায়ন করলে পূর্ণ মেয়াদের মুনাফার হার পাওয়া যায় না এবং আগে দেওয়া অতিরিক্ত মুনাফা মূল টাকা থেকে কাটা যেতে পারে।
কত টাকা দিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনা যায়?
১ লাখ, ২ লাখ, ৫ লাখ এবং ১০ লাখ টাকার মূল্যমান রয়েছে। একক নামে ব্যক্তির সর্বোচ্চ সীমা ৩০ লাখ এবং যুগ্ম নামে ৬০ লাখ টাকা।
মুনাফার হার কত?
৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগে তিন বছর শেষে হার ১১.৮২ শতাংশ। এর বেশি বিনিয়োগে হার ১১.৭৭ শতাংশ। তবে বর্তমান হার কেনার আগে সংশ্লিষ্ট অফিসে যাচাই করা উচিত।
মুনাফা কি প্রতি মাসে পাওয়া যায়?
না। এই সঞ্চয়পত্রে মুনাফা তিন মাস পরপর তোলার সুযোগ থাকে। তাই মুনাফা জমার তারিখ ও অর্থ পাওয়ার পদ্ধতি বিক্রয়কেন্দ্র থেকে নিশ্চিত করে নিন।
টিআইএন না থাকলে কর কত কাটবে?
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী টিআইএন না থাকলে মুনাফার ১৫ শতাংশ অগ্রিম কর কাটা হবে। টিআইএন থাকলে হার ১০ শতাংশ। তবে রিটার্নে সমন্বয়ের নিয়ম প্রযোজ্য কি না, তা এনবিআরের সর্বশেষ নির্দেশনায় দেখুন।
সঞ্চয়পত্রের মালিক মারা গেলে নমিনি কী করতে পারেন?
নমিনি সঙ্গে সঙ্গে নগদায়ন করে অর্থ তুলতে পারেন। আবার মেয়াদ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত রেখে প্রতি তিন মাস অন্তর মুনাফা নেওয়ার বিকল্পও রয়েছে।
মেয়াদ শেষে কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবার বিনিয়োগ করা যায়?
মেয়াদপূর্তির আগে ইস্যু অফিসে যোগাযোগ করে স্বয়ংক্রিয় পুনঃবিনিয়োগের সুবিধা নেওয়া যায়। তবে পুনঃবিনিয়োগের সময়কার হার ও শর্ত নতুন করে যাচাই করতে হবে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শেষ যাচাই
যে সঞ্চয়পত্র সবাই কিনতে পারেন, তিন মাস পরপর মুনাফার টাকা তোলা যায়—এই বৈশিষ্ট্যের কারণে তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র অনেকের জন্য ব্যবহারযোগ্য হতে পারে। তবু কেবল মুনাফার হার দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। তাই বিনিয়োগসীমা, কর, জরুরি নগদ প্রয়োজন এবং মেয়াদপূর্ব ভাঙানোর সম্ভাবনা একসঙ্গে বিবেচনা করুন।
কেনার আগে সংশ্লিষ্ট জেলা সঞ্চয় অফিস, জাতীয় সঞ্চয় বিশেষ ব্যুরো, ব্যাংক বা ডাকঘর থেকে সর্বশেষ হার ও প্রয়োজনীয় নথির তালিকা নিন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত করের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশনা এবং প্রয়োজন হলে কর বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিলে ভুলের ঝুঁকি কমে।
তথ্য যাচাই ও আপডেট: মুনাফার হার, উৎসে কর, বিনিয়োগসীমা এবং নগদায়নের নিয়ম সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। সর্বশেষ যাচাই: অক্টোবর ২০২৬।


