সরকারি কর্মচারীদের জন্য লিয়েন বিধিমালা ২০২১ হলো বাংলাদেশ সরকারের প্রণীত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধিমালা, যা সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ক্ষমতাবলে কার্যকর করা হয়েছে। এই বিধিমালায় একজন সরকারি কর্মচারী কখন লিয়েন অর্জন করবেন, কীভাবে তা সংরক্ষণ করবেন, কোন পরিস্থিতিতে বৈদেশিক বা বেসরকারি চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন এবং কতদিন পর্যন্ত লিয়েন বহাল থাকবে এসব বিষয় স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। যারা সরকারি চাকরিতে কর্মরত কিংবা ভবিষ্যতে সরকারি চাকরির বিভিন্ন প্রশাসনিক বিধান সম্পর্কে জানতে চান, তাদের জন্য এই বিধিমালা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেকেই মনে করেন, লিয়েন মানেই চাকরি ছেড়ে অন্যত্র যোগ দেওয়ার অনুমতি। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। লিয়েন একটি আইনগত অধিকার, যা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে একজন স্থায়ী সরকারি কর্মচারীকে তার মূল পদে ফিরে আসার সুযোগ সংরক্ষণ করে। তবে এই অধিকার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা, সময়সীমা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
এই লেখায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য লিয়েন বিধিমালা ২০২১-এর আলোকে লিয়েনের সংজ্ঞা, অর্জনের নিয়ম, সংরক্ষণের শর্ত, বাস্তব প্রয়োগ এবং গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হয়েছে। তথ্যগুলো সরকারি বিধিমালার ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য লিয়েন বিধিমালা ২০২১ কী?
সরকারি কর্মচারীদের জন্য লিয়েন বিধিমালা ২০২১ হলো এমন একটি প্রশাসনিক বিধিমালা, যার মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের লিয়েন সংক্রান্ত অধিকার, দায়িত্ব এবং প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণীত হয়েছে এবং সরকারি কর্মচারীদের বৈদেশিক সার্ভিস, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অথবা অন্যান্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে যোগদানের ক্ষেত্রে লিয়েন সংরক্ষণের বিধান স্পষ্ট করেছে।
এই বিধিমালার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সরকারি প্রশাসনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে দক্ষ সরকারি কর্মচারীদের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুযোগ প্রদান করা। ফলে একদিকে কর্মচারীর প্রশাসনিক অধিকার সংরক্ষিত হয়, অন্যদিকে সরকারেরও প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে।
এছাড়া এই বিধিমালায় লিয়েনের সর্বোচ্চ সময়সীমা, অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা, সরকারি সম্পদ হস্তান্তর, পুনরায় যোগদানের নিয়ম এবং সরকারি চাকরির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বিভিন্ন শর্ত বিস্তারিতভাবে উল্লেখ রয়েছে।
লিয়েন কী এবং কীভাবে এটি অর্জিত হয়?
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ধারা ২(১২) অনুযায়ী, লিয়েন হলো একজন সরকারি কর্মচারীর কোনো স্থায়ী পদে আইনগত অধিকার। অর্থাৎ, তিনি যদি নির্ধারিত নিয়মে অন্যত্র দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে নির্দিষ্ট শর্তে সেই মূল পদে পুনরায় ফিরে আসার অধিকার সংরক্ষিত থাকে।
তবে এই অধিকার সবাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পান না। একজন কর্মচারীকে প্রথমে স্থায়ীভাবে কোনো পদে নিয়মিত নিয়োগপ্রাপ্ত হতে হয়। তখনই তিনি ওই পদে লিয়েন অর্জন করেন। যদি পরবর্তীতে তিনি অন্য একটি স্থায়ী পদে নিয়মিতভাবে নিয়োগ পান, তাহলে পূর্ববর্তী পদের লিয়েন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং নতুন পদেই লিয়েন কার্যকর হয়।
নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী শিক্ষানবিশ অবস্থায় লিয়েন অর্জন করতে পারেন না। শিক্ষানবিশকাল সফলভাবে সম্পন্ন করে স্থায়ী হওয়ার পরই লিয়েন কার্যকর হয়। লিয়েন সাধারণত নিচের অবস্থাগুলোতেও সংরক্ষিত থাকতে পারে:
- স্থায়ী পদে নিয়মিত কর্মরত থাকা অবস্থায়
- বৈদেশিক সার্ভিসে নিয়োজিত থাকলে
- অস্থায়ী বা অফিসিয়েটিং পদে দায়িত্ব পালন করলে
- অনুমোদিত ছুটিতে থাকলে
- সাময়িক বরখাস্ত অবস্থায় থাকলেও, বিধি অনুযায়ী
- নিয়ম অনুযায়ী অনুমোদিত লিয়েনকাল চলাকালীন
এখানে একটি বাস্তবধর্মী বিষয় উল্লেখযোগ্য। ধরুন, একজন সহকারী কমিশনার জাতিসংঘের একটি অনুমোদিত সংস্থায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যোগদানের সুযোগ পেলেন। তিনি যদি সংশ্লিষ্ট বিধি অনুসরণ করে লিয়েন অনুমোদন গ্রহণ করেন, তাহলে নির্ধারিত সময় শেষে পুনরায় সরকারি চাকরিতে ফিরে আসার সুযোগ বজায় থাকবে। তবে এই সুযোগ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে বিধিমালায় নির্ধারিত শর্ত পূরণের ওপর।
এই কারণেই সরকারি কর্মচারীদের জন্য লিয়েন বিধিমালা ২০২১ কেবল একটি প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি সরকারি কর্মচারীর চাকরিগত অধিকার ও দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত কাঠামো।
বৈদেশিক বা বেসরকারি চাকরির জন্য আবেদন করার নিয়ম
সরকারি কর্মচারীদের জন্য লিয়েন বিধিমালা ২০২১ অনুযায়ী একজন সরকারি কর্মচারী নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে বৈদেশিক বা বেসরকারি চাকরির জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে আবেদন করার স্বাধীনতা থাকলেও পুরো প্রক্রিয়াটি প্রশাসনিক নিয়মের আওতায় পরিচালিত হয়। ফলে আবেদন করার আগে কোন প্রতিষ্ঠানে সরকারের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন এবং কোথায় কেবল অবহিত করলেই যথেষ্ট—এই পার্থক্য জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারী সরাসরি সংশ্লিষ্ট বিদেশি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে পারবেন। তবে আবেদনের একটি অনুলিপি অবিলম্বে নিজের চাকরি নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগে পাঠাতে হবে। এই নিয়মের উদ্দেশ্য হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কর্মচারীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত রাখা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ দেওয়া।
সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে অবস্থিত কোনো বৈদেশিক কূটনৈতিক মিশনে চাকরির জন্য আবেদন করতে চাইলে সরকারের পূর্বানুমোদন গ্রহণ করতে হবে। কারণ এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বিষয় জড়িত থাকতে পারে। অন্যদিকে কয়েক ধরনের প্রতিষ্ঠানে আবেদন করার জন্য আলাদা পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা নেই। এসব ক্ষেত্রে কেবল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগকে অবহিত করলেই বিধিমালার শর্ত পূরণ হয়।
যেসব প্রতিষ্ঠানে আবেদন করতে সরকারের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন হয় না
- বিদেশে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক সংস্থা
- দেশ বা বিদেশে অবস্থিত জাতিসংঘ এবং এর অধীনস্থ বহুজাতিক সংস্থাসমূহ
- বিদেশি বা বিদেশি সহায়তাপ্রাপ্ত বেসরকারি সংস্থা (এনজিও)
- সরকারের অংশীদারিত্ব বা মালিকানাধীন লিমিটেড কোম্পানি
তবে অনুমোদনের প্রয়োজন না থাকলেও আবেদন গোপন রাখা যাবে না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগকে লিখিতভাবে অবহিত করতে হবে। এটি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।আরও একটি বিশেষ বিষয় বিধিমালায় উল্লেখ রয়েছে। যদি কোনো বিদেশি রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান আবেদনপত্র নিজ মন্ত্রণালয় বা বিভাগের মাধ্যমে পাঠানোর নির্দেশ দেয়, তাহলে আবেদনকারীকে অবশ্যই সেই নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। সরাসরি আবেদন করলে তা গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে।
বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বা আন্তঃসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরকারি কর্মচারীদের আবেদন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পাঠাতে বলা হয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই নিরাপদ এবং বিধিসম্মত।
লিয়েন সংরক্ষণের শর্তাবলী ও সর্বোচ্চ সময়সীমা
লিয়েন অর্জন করার মতোই সেটি সংরক্ষণ করাও নির্দিষ্ট শর্তের ওপর নির্ভরশীল। সরকারি কর্মচারীদের জন্য লিয়েন বিধিমালা ২০২১ অনুযায়ী একজন সরকারি কর্মচারী সমগ্র চাকরি জীবনে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত লিয়েন সংরক্ষণ করতে পারেন। এই পাঁচ বছর ধারাবাহিকভাবেও হতে পারে, আবার প্রয়োজন অনুসারে বিচ্ছিন্ন সময়েও ব্যবহার করা যেতে পারে।
অনেকেই মনে করেন, লিয়েনকালে সরকারি চাকরির সব সুবিধা আগের মতো বহাল থাকে। বাস্তবে তা নয়। বিধিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, লিয়েনকাল কেবল জ্যেষ্ঠতা, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এবং অবসর-পরবর্তী পেনশন গণনার ক্ষেত্রে বিবেচিত হবে। কিন্তু এই সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মচারী সরকারি বেতন, ভাতা কিংবা ছুটির সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন না।
অর্থাৎ একজন কর্মকর্তা যদি অনুমোদিতভাবে চার বছরের জন্য কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকেন, তাহলে সেই সময় সরকারি বেতন পাবেন না। তবে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে তার চাকরির ধারাবাহিকতা এবং জ্যেষ্ঠতার হিসাব সংরক্ষিত থাকবে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদি কোনো কর্মচারীর লিয়েনকাল একটানা পাঁচ বছরের বেশি হয়ে যায় এবং এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ সিদ্ধান্ত না থাকে, তাহলে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (বি.এস.আর.) প্রথম খণ্ডের বিধি ৩৪ অনুযায়ী তার সরকারি চাকরির অবসান ঘটতে পারে। এর ফলে সরকারের সঙ্গে তার চাকরিগত সম্পর্কও স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে।
এই কারণে লিয়েনের মেয়াদ গণনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে বা অন্য প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় কর্মরত থাকা ব্যক্তিদের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। অন্যথায় চাকরি সম্পর্কিত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে, যা পরবর্তীতে প্রশাসনিক বা আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
লিয়েন অনুমোদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া
শুধু আবেদন করলেই লিয়েন অনুমোদিত হয় না। সরকারি কর্মচারীদের জন্য লিয়েন বিধিমালা ২০২১ অনুযায়ী লিয়েন মঞ্জুরের আগে একজন সরকারি কর্মচারীকে একাধিক প্রশাসনিক ও আর্থিক শর্ত পূরণ করতে হয়। এসব শর্তের উদ্দেশ্য হলো সরকারি সম্পদ, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং আর্থিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখা।
১. চাকরিতে স্থায়ী হওয়া এবং ন্যূনতম চাকরিকাল
লিয়েন সংরক্ষণের জন্য প্রথম শর্ত হলো কর্মচারীকে অবশ্যই স্থায়ী পদে নিয়মিতভাবে কর্মরত থাকতে হবে। এছাড়া তার চাকরিকাল কমপক্ষে পাঁচ বছর হতে হবে। অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক বা শিক্ষানবিশ অবস্থায় কর্মরত কোনো ব্যক্তি এই সুবিধা দাবি করতে পারেন না।
এই বিধানটি নিশ্চিত করে যে, শুধুমাত্র পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা অর্জনকারী সরকারি কর্মচারীরাই লিয়েনের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। ফলে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতাও বজায় থাকে।
২. সরকারি সম্পদ ও পাওনা নিষ্পত্তি
লিয়েন অনুমোদনের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে তার দায়িত্বে থাকা সব সরকারি সম্পদ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিতে হবে। এর মধ্যে থাকতে পারে—
- সরকারি গাড়ি
- সরকারি টেলিফোন বা মোবাইল সংযোগ
- কম্পিউটার ও আইটি সরঞ্জাম
- সরকারি বই, নথি ও রেকর্ড
- অফিসের অন্যান্য মালামাল
এছাড়া সরকারের কাছে যদি কোনো আর্থিক পাওনা বা বকেয়া থাকে, তবে সেটিও পরিশোধ করতে হবে। এসব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না হলে লিয়েন অনুমোদন বিলম্বিত হতে পারে।
৩. অনুমোদনের আগে অন্য চাকরিতে যোগদান করা যাবে না
বিধিমালার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, লিয়েন অনুমোদনের আদেশ জারি হওয়ার আগে কোনো সরকারি কর্মচারী তার বর্তমান কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবেন না। একইভাবে বৈদেশিক বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগদান করাও বিধিবহির্ভূত হবে।
অর্থাৎ, আবেদন করা এবং অনুমোদন পাওয়া—এই দুই বিষয় এক নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের আগে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে সেটি প্রশাসনিক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
৪. ও.এস.ডি. (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে নিয়োগ
লিয়েন সংক্রান্ত বিধিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলক কম আলোচিত বিষয় হলো ও.এস.ডি. (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে নিয়োগ। বিধিমালা অনুযায়ী, লিয়েনের আবেদন অনুমোদিত হলে আদেশ কার্যকর হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে ও.এস.ডি. হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হবে।
এই ধাপটি প্রশাসনিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর দাপ্তরিক দায়িত্ব যথাযথভাবে হস্তান্তর করা যায় এবং নতুন কর্মস্থলে যোগদানের আগে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
ধরুন, একজন যুগ্মসচিব একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় তিন বছরের জন্য নিয়োগ পেলেন। তিনি আবেদন করলেন এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনও পেলেন। কিন্তু বিদেশে যোগদানের আগে তাকে ও.এস.ডি. হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে। এরপর আনুষ্ঠানিক আদেশ কার্যকর হলে তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে পারবেন। এই ধাপটি এড়িয়ে সরাসরি যোগদান করলে তা বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।
৫. লিয়েনকালে আর্থিক বাধ্যবাধকতা
অনেকের ধারণা, লিয়েনকালীন সময়ে সরকারি চাকরির সব ধরনের আর্থিক দায়িত্ব স্থগিত থাকে। কিন্তু বিধিমালায় ভিন্ন নির্দেশনা রয়েছে। লিয়েনকালেও নির্ধারিত কিছু অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়।
- যৌথবীমা তহবিলের চাঁদা
- কল্যাণ তহবিলের চাঁদা
- ভবিষ্য তহবিলে প্রযোজ্য জমা
- পেনশন কন্ট্রিবিউশন
- লিভ-স্যালারি কন্ট্রিবিউশন
- সরকার নির্ধারিত অন্যান্য প্রাপ্য অর্থ
এই অর্থসমূহ যথাসময়ে পরিশোধ না করলে ভবিষ্যতে পেনশন, চাকরির ধারাবাহিকতা বা অন্যান্য প্রশাসনিক বিষয়ে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই লিয়েনকালীন আর্থিক দায়বদ্ধতা অবহেলা করা উচিত নয়।
৬. সরকারি বাসভবন ব্যবহারের নিয়ম
যদি কোনো সরকারি কর্মচারী সরকারি আবাসনে বসবাস করেন, তাহলে বৈদেশিক চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে সেই বাসভবন খালি করতে হবে। একই সঙ্গে ওই ছয় মাসের নির্ধারিত ভাড়াও পরিশোধ করতে হবে।
বাস্তব দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরা যেতে পারে, একজন সরকারি প্রকৌশলী বিদেশে চার বছরের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলেন। তিনি সরকারি কোয়ার্টারে বসবাস করছিলেন। লিয়েন অনুমোদনের পর বিদেশে যাওয়ার ছয় মাসের মধ্যে তাকে বাসভবন খালি করতে হবে এবং বিধি অনুযায়ী প্রাপ্য ভাড়া পরিশোধ করতে হবে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
লিয়েন শেষে সরকারি চাকরিতে পুনরায় যোগদানের নিয়ম
সরকারি কর্মচারীদের জন্য লিয়েন বিধিমালা ২০২১ অনুযায়ী লিয়েন একটি স্থায়ী সুবিধা নয়। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে বিধি অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে পুনরায় যোগদান করতে হবে। এই প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সময়সীমা ও প্রশাসনিক নিয়ম রয়েছে, যা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক।
বিধিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, অনুমোদিত লিয়েনকাল শেষ হওয়ার পর সরকারি কর্মচারীকে সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহের মধ্যে নিজ দপ্তর বা কর্তৃপক্ষের কাছে যোগদান করতে হবে। এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং চাকরির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক শর্ত।
যদি কোনো কর্মচারী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যোগদান না করেন, তাহলে সেই অনুপস্থিতিকে অননুমোদিত অনুপস্থিতি হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে বিদেশে বা অন্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় লিয়েনের মেয়াদ শেষ হওয়ার তারিখ সম্পর্কে আগে থেকেই সচেতন থাকা জরুরি।
মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ফিরে আসা কি সম্ভব?
হ্যাঁ। কোনো কর্মচারী চাইলে অনুমোদিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই সরকারি চাকরিতে ফিরে আসতে পারেন। তবে এজন্য নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
এক্ষেত্রে তাকে লিয়েনের অবশিষ্ট সময় বাতিল করার আবেদনপত্র এবং সরকারি চাকরিতে পুনরায় যোগদানের আবেদন একসঙ্গে দাখিল করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় আদেশ জারি করলে তিনি পুনরায় পূর্বের সরকারি দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন।
এই বিধানটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাদের জন্য, যারা বিদেশি বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
বি.এস.আর. পার্ট-১ অনুযায়ী লিয়েন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বিধান
সরকারি কর্মচারীদের জন্য লিয়েন বিধিমালা ২০২১ বুঝতে হলে বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (বি.এস.আর.) পার্ট-১-এর কয়েকটি মৌলিক বিধান সম্পর্কেও ধারণা থাকা প্রয়োজন। কারণ লিয়েন সংক্রান্ত একাধিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এই বিধানগুলোর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
লিয়েন থাকা পদে অন্য কাউকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া যায় না
বি.এস.আর. পার্ট-১ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারীর লিয়েন যদি একটি নির্দিষ্ট পদে বহাল থাকে, তাহলে সেই পদে অন্য কাউকে স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। কারণ ওই পদে মূল অধিকার এখনও সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর কাছেই সংরক্ষিত থাকে।
এতে সরকারি প্রশাসনে কর্মচারীর অধিকার রক্ষা হয় এবং অনুমোদিত লিয়েন শেষে তিনি পূর্বের পদে ফিরে আসার সুযোগ পান।
কম বেতনের পদে স্থায়ী বা অফিসিয়েটিং বদলি দেওয়ার সীমাবদ্ধতা
বি.এস.আর.-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো, যে পদের বেতন লিয়েন থাকা পদের বেতনের তুলনায় কম, সেখানে কাউকে স্থায়ী বা অফিসিয়েটিং ভিত্তিতে বদলি করা যাবে না। এই নিয়মের মাধ্যমে প্রশাসনিক ভারসাম্য এবং পদমর্যাদার সঙ্গতি বজায় রাখা হয়।
লিখিত সম্মতি ছাড়া লিয়েন বাতিল করা যায় না
একজন সরকারি কর্মচারীর লিখিত অনুরোধ বা সম্মতি ছাড়া তার স্থগিতকৃত লিয়েন বাতিল করা যাবে না। এই বিধান কর্মচারীর চাকরিগত অধিকার সুরক্ষিত রাখে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে।অর্থাৎ, কোনো কর্মকর্তা অনুমোদিতভাবে লিয়েনে থাকলে শুধুমাত্র প্রশাসনিক সুবিধার জন্য তার লিয়েন একতরফাভাবে বাতিল করা যাবে না, যদি না বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি বা প্রশাসনিক কারণ বিদ্যমান থাকে।
যে বিষয়গুলো আবেদন করার আগে অবশ্যই যাচাই করা উচিত
বৈদেশিক বা বেসরকারি চাকরিতে যোগদানের আগ্রহ থাকলে শুধুমাত্র চাকরির অফার পাওয়াই যথেষ্ট নয়। সরকারি কর্মচারীদের জন্য লিয়েন বিধিমালা ২০২১ অনুযায়ী আবেদন করার আগে কয়েকটি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা উচিত।
- আপনি স্থায়ী সরকারি কর্মচারী কি না।
- চাকরিকাল কমপক্ষে পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে কি না।
- সরকারি সম্পদ ও দাপ্তরিক দায়িত্ব যথাযথভাবে হস্তান্তরের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে কি না।
- সরকারের কাছে কোনো আর্থিক পাওনা বাকি আছে কি না।
- যে প্রতিষ্ঠানে আবেদন করছেন, সেখানে পূর্বানুমোদন প্রয়োজন কি না।
- লিয়েন অনুমোদনের আগে অন্য প্রতিষ্ঠানে যোগদান করা হবে না—এ বিষয়টি নিশ্চিত করা।
- সরকারি বাসভবন থাকলে নির্ধারিত সময়ে খালি করার পরিকল্পনা রাখা।
- লিয়েনকালীন আর্থিক কন্ট্রিবিউশন কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা।
এসব বিষয় আগেভাগে যাচাই করলে পরবর্তীতে প্রশাসনিক জটিলতা, বিভাগীয় সমস্যা বা লিয়েন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
সরকারি কর্মচারীদের জন্য লিয়েন বিধিমালা ২০২১ কী?
এটি সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ক্ষমতাবলে প্রণীত একটি বিধিমালা, যেখানে সরকারি কর্মচারীদের লিয়েন অর্জন, সংরক্ষণ, অনুমোদন এবং পুনরায় যোগদানের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে।
লিয়েন বলতে কী বোঝায়?
লিয়েন হলো একজন স্থায়ী সরকারি কর্মচারীর তার স্থায়ী পদের ওপর আইনগত অধিকার, যার মাধ্যমে নির্ধারিত শর্তে তিনি সেই পদে পুনরায় ফিরে আসতে পারেন।
শিক্ষানবিশ অবস্থায় কি লিয়েন অর্জিত হয়?
না। শিক্ষানবিশ অবস্থায় লিয়েন অর্জিত হয় না। স্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার পরই লিয়েন কার্যকর হয়।
একজন সরকারি কর্মচারী সর্বোচ্চ কত বছর লিয়েন সংরক্ষণ করতে পারেন?
বিধিমালা অনুযায়ী সমগ্র চাকরি জীবনে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত লিয়েন সংরক্ষণ করা যায়। এটি ধারাবাহিক বা বিচ্ছিন্ন—উভয়ভাবেই হতে পারে।
লিয়েনকালে কি সরকারি বেতন ও ভাতা পাওয়া যায়?
না। লিয়েনকালে সরকারি বেতন, ভাতা বা ছুটির সুবিধা পাওয়া যায় না। তবে নির্ধারিত শর্তে জ্যেষ্ঠতা, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এবং পেনশন গণনার ক্ষেত্রে এই সময় বিবেচিত হয়।
লিয়েন অনুমোদনের আগে কি অন্য চাকরিতে যোগ দেওয়া যায়?
না। লিয়েনের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারী বৈদেশিক বা বেসরকারি চাকরিতে যোগদান করতে পারেন না।
ও.এস.ডি. হিসেবে নিয়োগ কেন দেওয়া হয়?
লিয়েন অনুমোদনের আদেশ কার্যকর হওয়ার আগে প্রশাসনিক দায়িত্ব হস্তান্তর এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ও.এস.ডি.) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
লিয়েন শেষ হলে কত দিনের মধ্যে সরকারি চাকরিতে যোগদান করতে হয়?
অনুমোদিত লিয়েনকাল শেষ হওয়ার পর সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহের মধ্যে সরকারি চাকরিতে পুনরায় যোগদান করতে হয়।
সরকারি বাড়িতে বসবাস করলে কী নিয়ম প্রযোজ্য?
বৈদেশিক চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে সরকারি বাসভবন খালি করতে হবে এবং প্রযোজ্য ভাড়া পরিশোধ করতে হবে।
লিয়েন সংক্রান্ত তথ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস কোথায় পাওয়া যাবে?
সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রণীত মূল বিধিমালা, সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮, বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (বি.এস.আর.) এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নির্দেশনা থেকে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়।


