নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নে সরকার দুই ধাপের পথে এগোচ্ছে, তবে প্রাথমিক প্রস্তাবে প্রথম ধাপেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পূর্ণ নতুন মূল বেতন (Basic Pay) কার্যকর করার সম্ভাবনা জোরালো হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বেতন কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। এই প্রতিবেদনে পুরো প্রক্রিয়া, সম্ভাব্য বেতন বৃদ্ধি এবং সময়সূচি নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে বর্তমান অগ্রগতি কী?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের কাজ এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের কমিটি ইতোমধ্যে পে কমিশনের সুপারিশ মূল্যায়ন শেষ করে বাস্তবায়নের রোডম্যাপ তৈরি করেছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে এই রোডম্যাপ অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এই কমিটি বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য গঠিত পৃথক তিনটি পে কমিশনের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সুপারিশ প্রস্তুত করেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এখন সবচেয়ে বড় বিষয় হলো প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদন। অনুমোদন মিললেই জুলাইয়ের মাঝামাঝি বা তার পরের সপ্তাহে নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা হতে পারে। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাস্তবায়নের কাঠামো চূড়ান্ত হলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পরই সম্ভব।
কেন দুই ধাপে বাস্তবায়ন হলেও প্রথম ধাপে সম্পূর্ণ মূল বেতন?
প্রাথমিক পরিকল্পনায় সরকার নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য দুই বছর এবং তিন বছর—এই দুটি বিকল্প বিবেচনা করছিল। তিন বছরের পরিকল্পনায় প্রথম দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ করে কার্যকর এবং তৃতীয় বছরে বিভিন্ন ভাতা বাস্তবায়নের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু অর্থ বিভাগ জানিয়েছে, ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম (IBAS++)-এ কারিগরি জটিলতা এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দুই ধাপে মূল বেতন কার্যকর করলে সরকারের এই কেন্দ্রীয় অ্যাকাউন্টিং সিস্টেমে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতো। ফলে সামগ্রিকভাবে পে-স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়িত হলেও প্রথম ধাপেই সম্পূর্ণ নতুন মূল বেতন কার্যকর করার সুপারিশ করেছে অর্থ বিভাগ। দ্বিতীয় ধাপে ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা সমন্বয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
IBAS++ কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
IBAS++ হলো সরকারের একটি সমন্বিত বাজেট ও অ্যাকাউন্টিং সিস্টেম। এই সিস্টেমের মাধ্যমেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান করা হয়। কারিগরি কারণে এই সিস্টেমে জটিলতা সৃষ্টি হলে বেতন প্রদানে বিঘ্ন ঘটতে পারে। তাই সরকার সহজ ও কার্যকর পথ বেছে নিচ্ছে।
কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়তে পারে?
কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, বিভিন্ন গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির হার ভিন্ন হবে। নিচে একটি সম্ভাব্য তুলনামূলক চিত্র দেওয়া হলো:
| গ্রেড | সম্ভাব্য মূল বেতন বৃদ্ধির হার (শতাংশ) | ব্যাখ্যা |
|---|---|---|
| ১ম থেকে ১০ম গ্রেড | ১০০% থেকে শুরু | উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য সর্বনিম্ন ১০০% বৃদ্ধি প্রস্তাব করা হয়েছে। |
| ১১তম থেকে ২০তম গ্রেড | গড়ে প্রায় ১৩০% | নিম্ন ও মধ্য গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বেশি সুবিধা পেতে পারেন। |
| সামগ্রিক গড় | ১০০% থেকে ১৪২% | গ্রেডভেদে মূল বেতন এই সীমার মধ্যে বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। |
উল্লেখ্য, পাশাপাশি বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধাও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে নবম পে কমিশন। তবে চূড়ান্ত হার নির্ভর করছে সরকারের অনুমোদনের ওপর। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়িত হলে এটি ২৭তম বিসিএস বেতন নির্ধারণ ২০২৬-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে, কারণ বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তারাও এই পে-স্কেলের আওতাভুক্ত হবেন।
বাজেটে কত টাকা রাখা হয়েছে এবং তা কোথায় ব্যয় হবে?
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার বাজেট বক্তৃতায় ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেন। তিনি উল্লেখ করেন, গত ১১ বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একই বেতন কাঠামোর আওতায় রয়েছেন এবং এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, এই ৪৪ হাজার কোটি টাকা নেট পাবলিক সার্ভিস খাতে ব্যয় করা হবে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এ খাতে ব্যয় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকায়। এই অর্থের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা সমন্বয় করা হবে।
অষ্টম পে-স্কেলের অভিজ্ঞতা কী কাজে লাগবে?
এর আগে ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেলও দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। প্রথম বছরে সংশোধিত মূল বেতন এবং পরবর্তী বছরে সংশোধিত বিভিন্ন ভাতা কার্যকর করা হয়েছিল। বর্তমানে সরকার প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য বছরে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে।
কী অপেক্ষা করছে এখন?
নবম জাতীয় পে-স্কেলের চূড়ান্ত ভাগ্য এখন প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের রোডম্যাপ পাওয়ার পর সেটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন মিললে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপরই কার্যকর হবে নতুন বেতন কাঠামো।
কিন্তু কিছু বিষয় এখনও স্পষ্ট নয়। যেমন—প্রথম ধাপের পর দ্বিতীয় ধাপ কবে বাস্তবায়িত হবে? ভাতা বৃদ্ধির চূড়ান্ত হার কত হবে? সশস্ত্র বাহিনীর পে-স্কেলের সঙ্গে বেসামরিক প্রশাসনের পে-স্কেলের সমন্বয় কীভাবে হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবুও, দীর্ঘদিন ধরে নতুন পে-স্কেলের অপেক্ষায় থাকা সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য এটা নিশ্চিত যে, বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
নবম পে-স্কেল কবে থেকে কার্যকর হবে?
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পেলে আগামী জুলাই ২০২৬ মাসের মাঝামাঝি সময়ে গেজেট প্রকাশিত হতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও বাস্তবায়নের তারিখ নির্ভর করছে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর। অর্থমন্ত্রী ইতোমধ্যে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
নবম পে-স্কেলের আওতায় কারা পড়বেন?
এই পে-স্কেলের আওতায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা পড়বেন। এছাড়াও বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা আলাদা পে কমিশনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হবেন। মোটামুটিভাবে, প্রায় ২৩ লাখ মানুষ এই পে-স্কেলের মাধ্যমে উপকৃত হবেন।
নবম পে-স্কেলে মূল বেতন কত শতাংশ বাড়তে পারে?
প্রাথমিক সুপারিশ অনুযায়ী, ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০% বা তার কিছুটা কম বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে, ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য গড়ে প্রায় ১৩০% এবং সামগ্রিকভাবে ১০০% থেকে ১৪২% পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত হার কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
দুই ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের অর্থ কী?
এর অর্থ হলো, সরকার একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল চালু করবে। তবে বর্তমান প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপেই সম্পূর্ণ নতুন মূল বেতন কার্যকর হবে। দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সমন্বয় করা হবে। এই কৌশলের মাধ্যমে সরকারের অ্যাকাউন্টিং সিস্টেমের জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে।
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নে বাজেটে কত টাকা রাখা হয়েছে?
২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই অর্থ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী ও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ও ভাতা সমন্বয়ে ব্যয় করা হবে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় এই খাতে ব্যয় ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বেড়েছে।
নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে এখন বাধা কী?
সবচেয়ে বড় বাধা হলো প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের রোডম্যাপ তৈরি হলেও তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন ও অনুমোদিত হওয়া বাকি। এছাড়া, IBAS++ সিস্টেমে কারিগরি জটিলতা এবং বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশের মধ্যে সমন্বয় সাধন করাও একটি চ্যালেঞ্জ। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সব প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।


