করমুক্ত আয়সীমা ২০২৬-২৭। বিস্তারিত তথ্য ও বিশেষ শ্রেণীর সীমা

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে আয়কর যেমন সরকারের রাজস্বের একটি বড় উৎস, তেমনি একজন নাগরিক হিসেবেও সেটি আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু প্রতি বছর আয়কর সংক্রান্ত নিয়মকানুন ও স্ল্যাবের পরিবর্তন নিয়ে অনেকের মনেই নানা প্রশ্ন থাকে। বিশেষ করে, ২০২৬-২৭ করবর্ষ থেকে করহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। এই আর্টিকেলে আমরা সেই পরিবর্তন নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে আপনার আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় কোনো বিভ্রান্তি না থাকে।

করমুক্ত আয়সীমা ২০২৬-২৭: কাদের জন্য কত?

সরকার গত বছর আয়কর আইন, ২০২৩ পাস করেছে, যার মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরের (২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১) জন্য করহার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে করদাতাদের জন্য অনেকটাই স্বস্তি এসেছে, কারণ আগামী পাঁচ বছর করহার আর পরিবর্তন হবে না। ২০২৬-২৭ করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ২০২৬-২৭ সাধারণ করদাতার জন্য রাখা হয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ, যদি আপনার বার্ষিক আয় এই সীমার মধ্যে থাকে, তাহলে আপনাকে কোনো আয়কর দিতে হবে না।

বিশেষ শ্রেণীর করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা

সরকার সমাজের বিভিন্ন বিশেষ শ্রেণীর নাগরিকদের কথা চিন্তা করে তাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা সাধারণের চেয়ে বেশি নির্ধারণ করেছে। নিচে এই শ্রেণীগুলো এবং তাদের জন্য প্রযোজ্য সীমা তুলে ধরা হলো:

করদাতার শ্রেণীকরমুক্ত আয়ের সীমা (টাকা)
সাধারণ ব্যক্তি করদাতা৩,৭৫,০০০
মহিলা করদাতা ও ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী নাগরিক৪,২৫,০০০
তৃতীয় লিঙ্গের করদাতা ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি৫,০০,০০০
গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এ আহত জুলাই যোদ্ধা৫,২৫,০০০

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, গত বছর আমার এক প্রতিবেশী, যিনি একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক, তিনি এই সুবিধার কথা জানতেন না। ফলে তিনি বছরে প্রায় ৮-১০ হাজার টাকা বেশি কর দিয়েছিলেন। তাই আপনার যদি এই বিশেষ শ্রেণীগুলোর মধ্যে পড়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় এই সুবিধাটি গ্রহণ করবেন।

২০২৬-২০২৭ এবং ২০২৭-২০২৮ করবর্ষের জন্য আয়কর স্ল্যাব

যাদের বার্ষিক আয় ৩,৭৫,০০০ টাকার বেশি, তাদের জন্য করহার নির্ধারণ করা হয়েছে আয়ের বিভিন্ন ধাপে। নিচের টেবিল থেকে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন আপনার আয়ের উপর কত টাকা কর দিতে হবে।

আয়ের ধাপ (করধাপ)করহার
প্রথম ৩,৭৫,০০০ টাকা পর্যন্তশূন্য (০%)
পরবর্তী ৩,০০,০০০ টাকা (অর্থাৎ ৩,৭৫,০০১ থেকে ৬,৭৫,০০০ টাকা)১০%
পরবর্তী ৪,০০,০০০ টাকা (অর্থাৎ ৬,৭৫,০০১ থেকে ১০,৭৫,০০০ টাকা)১৫%
পরবর্তী ৫,০০,০০০ টাকা (অর্থাৎ ১০,৭৫,০০১ থেকে ১৫,৭৫,০০০ টাকা)২০%
পরবর্তী ২০,০০,০০০ টাকা (অর্থাৎ ১৫,৭৫,০০১ থেকে ৩৫,৭৫,০০০ টাকা)২৫%
অবশিষ্ট টাকার উপর (৩৫,৭৫,০০০ টাকার বেশি)৩০%

উদাহরণস্বরূপ, ধরা যাক, আপনার বার্ষিক আয় ১২ লাখ টাকা। তাহলে আপনার কর গণনা হবে এভাবে:

  • প্রথম ৩.৭৫ লাখ টাকায় কর: ০ টাকা
  • পরবর্তী ৩ লাখ টাকায় (৬.৭৫ লাখ পর্যন্ত) কর: ৩,০০,০০০ টাকার ১০% = ৩০,০০০ টাকা
  • পরবর্তী ৪ লাখ টাকায় (১০.৭৫ লাখ পর্যন্ত) কর: ৪,০০,০০০ টাকার ১৫% = ৬০,০০০ টাকা
  • বাকি ১.২৫ লাখ টাকায় কর: ১,২৫,০০০ টাকার ২০% = ২৫,০০০ টাকা
  • সর্বমোট কর: ০ + ৩০,০০০ + ৬০,০০০ + ২৫,০০০ = ১,১৫,০০০ টাকা।

প্রতিবন্ধী সন্তানের পিতামাতার জন্য বিশেষ সুবিধা

যেসব করদাতার কোনো শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তান বা পোষ্য রয়েছে, তাদের জন্য সরকার আরেকটি বিশেষ সুবিধা দিয়েছে। এই ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পিতামাতা বা আইনানুগ অভিভাবকের করমুক্ত আয়ের সীমা আরও ৫০,০০০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, আপনার করমুক্ত আয়ের সীমার সাথে আরও ৫০,০০০ টাকা যোগ হবে। তবে মনে রাখবেন, যদি পিতা এবং মাতা উভয়েই করদাতা হন, তাহলে তাদের মধ্যে যেকোনো একজনই এই সুবিধা নিতে পারবেন। দুজন একসঙ্গে এই সুবিধা নিতে পারবেন না।

অনিবাসী বাংলাদেশিদের (প্রবাসীদের) জন্য করহার

অনেক প্রবাসী ভাই-বোন আছেন যারা দেশে ফিরে এসে বা দেশে থেকে আয়কর দেন। তাদের জন্য সুখবর হলো, আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অনিবাসী বাংলাদেশিসহ সকল স্বাভাবিক ব্যক্তির জন্য একই করহার এবং স্ল্যাব প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, আপনিও সাধারণ করদাতার মতো একই করমুক্ত আয়সীমা এবং করহারের আওতায় আসবেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন: ২০২৬-২০২৭ করবর্ষে সাধারণ করমুক্ত আয়ের সীমা কত?

উত্তর: ২০২৬-২০২৭ করবর্ষে সাধারণ ব্যক্তি করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। আপনার বার্ষিক আয় যদি এই সীমার মধ্যে থাকে, তবে আপনাকে কোনো আয়কর দিতে হবে না।

প্রশ্ন: ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের জন্য কি কোনো আয়কর সুবিধা আছে?

উত্তর: হ্যাঁ, নতুন আইন অনুযায়ী জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এ আহত গেজেটভুক্ত জুলাই যোদ্ধাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সীমা সাধারণ ও অন্যান্য বিশেষ শ্রেণীর চেয়ে বেশি।

প্রশ্ন: স্বামী-স্ত্রী উভয়েই করদাতা হলে প্রতিবন্ধী সন্তানের সুবিধা কে পাবেন?

উত্তর: যদি কোনো প্রতিবন্ধী সন্তানের পিতামাতা উভয়েই টিআইএন (TIN) ধারী করদাতা হন, তবে তাদের মধ্যে যেকোনো একজন (পিতা অথবা মাতা) এই বিশেষ সুবিধাটি ভোগ করতে পারবেন। অর্থাৎ, তাদের করমুক্ত আয়ের সীমার সাথে অতিরিক্ত ৫০,০০০ টাকা যোগ হবে। দুজন একসঙ্গে এই সুবিধা নিতে পারবেন না।

প্রশ্ন: অনিবাসী বাংলাদেশিদের (প্রবাসীদের) জন্য কি আলাদা কোনো করহার আছে?

উত্তর: না, আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী অনিবাসী বাংলাদেশিসহ সকল স্বাভাবিক ব্যক্তির জন্য একই করহার এবং স্ল্যাব প্রযোজ্য হবে। আলাদা কোনো করহার নেই।

প্রশ্ন: ২০২৬-২৭ করবর্ষে করহার কি আগামী পাঁচ বছর একই থাকবে?

উত্তর: হ্যাঁ, আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী ২০২৬-২৭ থেকে ২০৩০-৩১ করবর্ষ পর্যন্ত করহার ও করসীমা অপরিবর্তিত থাকবে। এটি করদাতাদের জন্য একটি বড় স্বস্তি, কারণ তারা আগামী পাঁচ বছরের জন্য কর পরিকল্পনা করতে পারবেন।

প্রশ্ন: করমুক্ত আয়সীমা ২০২৬-২৭-এর এই সুবিধা পেতে কি আলাদাভাবে কোনো আবেদন করতে হবে?

উত্তর: সাধারণত কোনো আলাদা আবেদনের প্রয়োজন নেই। আয়কর রিটার্ন ফর্ম পূরণ করার সময় আপনার বয়স, লিঙ্গ, প্রতিবন্ধী সনদ বা মুক্তিযোদ্ধা সনদ ইত্যাদির কপি জমা দিলেই কর কর্তৃপক্ষ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার জন্য প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা প্রয়োগ করবে।

আপডেট তারিখ: ১১ জুন, ২০২৬
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ গেজেট, তফসিল-২ (ধারা ১৫৯ দ্রষ্টব্য), আয়কর আইন ২০২৩।

Scroll to Top