সেহরির দোয়া: রমজানের ফজিলত ও নিয়ত করার সঠিক নিয়ম

মুসলিম উম্মাহর কাছে রমজান মাস হলো এক পবিত্র রহমতের সওগাত। বছর ঘুরে যখন এই মাসটি আমাদের দ্বারে ফিরে আসে, তখন প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে এক আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয়। রমজানের প্রতিটি আমলই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে রোজা শুরুর প্রথম ও প্রধান সোপান হলো সেহরি এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দোয়া বা নিয়ত। ইসলামি শরিয়তে সেহরির দোয়া বা রোজার নিয়ত করা একটি অপরিহার্য বিষয়। কারণ, নিয়ত ব্যতীত কোনো ইবাদত আল্লাহর দরবারে পূর্ণতা পায় না।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা রোজাকে আমাদের ওপর ফরজ করেছেন। সূরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ এই তাকওয়া অর্জনের পথ শুরু হয় শেষ রাতের সেহরি খাওয়ার মাধ্যমে। এই নিবন্ধে আমরা সেহরির গুরুত্ব, নিয়তের সহিহ পদ্ধতি এবং রোজা পালনের যাবতীয় আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

সেহরির দোয়া ও নিয়তের গুরুত্ব

সাধারণত আমরা দোয়া বলতে আল্লাহর কাছে কোনো কিছু প্রার্থনা করাকে বুঝি। তবে রোজার ক্ষেত্রে সেহরির দোয়া বলতে মূলত রোজার নিয়তকেই বোঝানো হয়ে থাকে। নিয়ত হলো মনের ইচ্ছা। আপনি যখন শেষ রাতে রোজা রাখার উদ্দেশ্যে ঘুম থেকে উঠে কিছু আহার করেন, তখনই আপনার অবচেতন মনে একটি নিয়ত তৈরি হয়ে যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে এই নিয়ত বা সংকল্পই হলো মুখ্য।

অনেকেই মনে করেন আরবিতে নির্দিষ্ট কিছু শব্দ উচ্চারণ না করলে হয়তো রোজা হবে না। এটি একটি ভুল ধারণা। নিয়ত যেহেতু অন্তরের বিষয়, তাই আপনি যদি মনে মনে সংকল্প করেন যে আপনি আজ রোজা রাখছেন, তবেই আপনার রোজা শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে মুখে উচ্চারণ করাকে অনেক আলেম উত্তম মনে করেন যাতে মনের ইচ্ছাটি আরও দৃঢ় হয়।

সেহরির দোয়া বা রোজার নিয়ত (আরবি ও বাংলা অর্থ)

রোজার নিয়ত বা সেহরির দোয়াটি অত্যন্ত সহজ এবং অর্থবহ। যারা মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত করতে চান, তারা নিচের দোয়াটি পাঠ করতে পারেন:

আরবি দোয়া: نويت ان اصوم غدا من شهر رمضان المبارك فرضا لك ياالله فتقবল منى انك انت السميع العليم

উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন আছুমা গাদাম মিন শাহরি রমাজানাল মুবারাকি ফারদাল্লাকা, ইয়া আল্লাহু ফাতাকাব্বাল মিন্নি ইন্নিকা আনতাস সামিউল আলিম।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আগামীকাল পবিত্র রমজান মাসে তোমার পক্ষ হতে ফরজ করা রোজা রাখার নিয়ত করলাম। অতএব তুমি আমার পক্ষ হতে তা কবুল করো, নিশ্চয়ই তুমি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।

এই দোয়াটি পাঠ করার মাধ্যমে একজন মুমিন বান্দা আল্লাহর কাছে তার ইবাদত কবুল করার প্রার্থনা জানায়। মনে রাখবেন, রমজানের রোজার নিয়ত সুবহে সাদিকের আগে থেকে শুরু করে দুপুরের ঘণ্টাখানেক আগ পর্যন্ত যেকোনো সময় করে নিলে তা শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে সুবহে সাদিকের আগেই নিয়ত করে নেওয়া সবচেয়ে উত্তম ও নিরাপদ।

নিয়ত সম্পর্কে কিছু জরুরি মাসয়ালা

  • রোজার নিয়ত প্রতিদিন করা ফরজ। পুরো মাসের জন্য একবার নিয়ত করলেই যথেষ্ট হবে না।
  • যদি কেউ ভুলবশত মুখে নিয়ত না করে কিন্তু সেহরি খায়, তবে তার রোজা হয়ে যাবে।
  • আরবিতে নিয়ত করা জরুরি নয়, নিজ মাতৃভাষায় নিয়ত করলেও তা সমানভাবে কার্যকর।
  • সুবহে সাদিকের পর থেকে দুপুর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নিয়ত করলে শর্ত হলো—এই সময়ের মধ্যে কিছু খাওয়া বা পান করা যাবে না।

সেহরি খাওয়ার ফজিলত ও বরকত

ইসলামে সেহরি খাওয়া শুধু একটি শারীরিক প্রয়োজন নয়, বরং এটি একটি বড় ইবাদত। নবী করিম (সা.) সেহরি খাওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা সেহরি খাও, কারণ সেহরিতে বরকত রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি)। এমনকি যদি এক ঢোক পানি দিয়েও হয়, তবুও সেহরি খাওয়া সুন্নাত। সেহরির দোয়া পাঠের পাশাপাশি এই বরকতটুকু হাসিল করা প্রতিটি মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।

অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপবাস এবং মুসলমানদের রোজার মধ্যে অন্যতম পার্থক্য হলো এই সেহরি। আহলে কিতাবরা অর্থাৎ ইহুদি ও খ্রিস্টানরা সেহরি খেত না। রাসূল (সা.) আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন তাদের থেকে নিজেদের আমলকে পৃথক রাখতে। তাই অল্প হলেও সেহরি খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত। এটি রোজা রাখার শক্তি জোগায় এবং ইবাদতে একাগ্রতা বৃদ্ধি করে।

সারণী ১: সেহরি ও ইফতারের কিছু মৌলিক পার্থক্য

বিষয়সেহরিইফতার
সময়সুবহে সাদিকের আগেসূর্যাস্তের ঠিক পর মুহূর্তে
গুরুত্বরোজা রাখার শক্তি জোগায়ধৈর্যের পুরস্কার ও আনন্দ
সুন্নাত আমলদেরি করে খাওয়া উত্তমদ্রুত ইফতার করা উত্তম
মূল দোয়ারোজার নিয়ত বা সেহরির দোয়াইফতারের দোয়া

সেহরি খাওয়ার সঠিক সময় ও নিয়ম

সেহরি খাওয়ার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। পবিত্র কুরআনের বিধান অনুযায়ী, সাদা সুতা কালো সুতা থেকে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ সুবহে সাদিক পর্যন্ত পানাহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আমাদের দেশে মসজিদের আজান বা ক্যালেন্ডারের সময় অনুযায়ী সেহরির শেষ সময় নির্ধারিত হয়। রাসুল (সা.)-এর সুন্নাত হলো রাতের শেষাংশে সেহরি খাওয়া। একেবারে মাঝরাতে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া সুন্নাতের পরিপন্থী।

অনেকে মনে করেন আজান শুরু হওয়া পর্যন্ত খাওয়া যায়। তবে সতর্কতামূলকভাবে আজানের অন্তত ৫-১০ মিনিট আগেই পানাহার বন্ধ করা উচিত। কারণ সুবহে সাদিক হয়ে যাওয়ার পর এক দানা খাবার পেটে গেলেও রোজা হবে না। সেহরি শেষে মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার করা এবং সেহরির দোয়া মনে মনে বা মুখে পাঠ করা একটি সুন্দর সমাপ্তি।

রমজানের সঠিক প্রস্তুতি ও বিভিন্ন মাসয়ালা সম্পর্কে আরও জানতে আপনি Eratechtips ওয়েবসাইটটি নিয়মিত অনুসরণ করতে পারেন, যেখানে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

সেহরিতে স্বাস্থ্যকর খাবার নির্বাচনের টিপস

সারাদিন না খেয়ে থাকার ফলে শরীরে শক্তির ঘাটতি হতে পারে। তাই সেহরিতে এমন খাবার নির্বাচন করা উচিত যা দীর্ঘক্ষণ শক্তি যোগাবে এবং তৃষ্ণা কমাবে। অনেক সময় আমরা সেহরিতে অতিরিক্ত তৈলাক্ত বা মশলাযুক্ত খাবার খেয়ে ফেলি, যা সারাদিন অ্যাসিডিটি বা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সেহরিতে যা খাবেন:

  • জটিল শর্করা যেমন—লাল চালের ভাত, ওটস বা রুটি। এগুলো ধীরে ধীরে হজম হয় এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে।
  • পর্যাপ্ত প্রোটিন যেমন—মাছ, মাংস, ডিম বা ডাল।
  • আঁশযুক্ত সবজি ও ফলমূল।
  • পর্যাপ্ত পানি (একবারে অনেক পানি না খেয়ে অল্প অল্প করে কয়েক গ্লাস পান করা ভালো)।

সেহরিতে যা এড়িয়ে চলবেন:

  • অতিরিক্ত চা বা কফি, কারণ এগুলো শরীরকে পানিশূন্য করে তুলতে পারে।
  • বেশি মিষ্টি বা লবণাক্ত খাবার।
  • ডিপ ফ্রাই করা বা ভাজাপোড়া জাতীয় খাবার।

সারণী ২: সেহরি ও স্বাস্থ্যের ভারসাম্য

খাবারের ধরনকেন খাবেন / কেন খাবেন না
আঁশযুক্ত খাবারকোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে এবং ক্ষুধা কম লাগে।
খেজুরতাৎক্ষণিক শক্তি যোগায় এবং সুন্নাত আমল।
লবণাক্ত খাবারতৃষ্ণা বাড়িয়ে দেয়, তাই এড়িয়ে চলা ভালো।
দই বা দুধপাকস্থলী ঠান্ডা রাখে এবং হজমে সহায়তা করে।

সেহরি নিয়ে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা

আমাদের সমাজে সেহরির দোয়া এবং সেহরি খাওয়া নিয়ে বেশ কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অনেকে মনে করেন, সেহরি না খেলে রোজা হবে না। এটি ভুল। সেহরি খাওয়া সুন্নাত, ফরজ নয়। কেউ যদি সেহরির সময় না জাগতে পারেন এবং কিছু না খেয়েই রোজা রাখেন, তবে তার রোজা হয়ে যাবে। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে এই বরকত ত্যাগ করা অনুচিত।

আরেকটি ভুল ধারণা হলো—নিয়ত করার পর আর কিছু খাওয়া যাবে না। আসলে নিয়ত করার অর্থ এই নয় যে আপনার পানাহার হারাম হয়ে গেল। সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত আপনি যতবার খুশি খেতে পারেন। নিয়ত হলো একটি মানসিক প্রস্তুতি। আবার অনেকে মনে করেন মাসিক চলাকালীন নারীদের জন্য সেহরি খাওয়া নিষেধ। আসলে অপবিত্র অবস্থায়ও সেহরি খাওয়া বা খাবারের প্রস্তুতি নেওয়াতে কোনো বাধা নেই, যদিও তখন রোজা রাখা ফরজ নয়।

সেহরির দোয়া ও ইবাদতের আধ্যাত্মিক দিক

শেষ রাতের দোয়া আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। এই সময়টিকে বলা হয় তাহাজ্জুদের সময়। আল্লাহ তাআলা এই সময় প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাদের ডাকতে থাকেন—কে আছো ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। কে আছো রিজিক চাইবে? আমি তাকে রিজিক দেব। তাই সেহরি খেতে উঠে শুধু খাবার খেয়েই শুয়ে না পড়ে, অন্তত দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া এবং কিছুক্ষণ জিকির করা উচিত।

আপনি যখন সেহরির দোয়া পাঠ করেন, তখন আপনার মনে এই অনুভূতি থাকা উচিত যে, আপনি কেবল ক্ষুধার্ত থাকার জন্য রোজা রাখছেন না, বরং আপনার স্রষ্টাকে সন্তুষ্ট করার জন্য একটি মহৎ ত্যাগের সূচনা করছেন। এই আধ্যাত্মিক সংযোগ আপনার রোজাকে প্রাণবন্ত করে তুলবে।

রমজানের প্রস্তুতি ও আমাদের করণীয়

রমজান মাস কেবল উপবাসের মাস নয়, এটি নিজেকে সংশোধন করার মাস। সেহরি থেকে শুরু করে ইফতার পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত যেন ইবাদতের মধ্যে কাটে সেই চেষ্টা করতে হবে। মিথ্যা বলা, গিবত করা এবং অনর্থক ঝগড়া বিবাদ থেকে দূরে থাকতে হবে। রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন। আপনি যদি সেহরির দোয়া পড়ে রোজা শুরু করেন এবং সারাদিন পাপকাজে লিপ্ত থাকেন, তবে সেই রোজার কোনো মূল্য আল্লাহর কাছে নেই।

তাই আসুন, আমরা প্রতিটি সেহরিতে বরকত তালাশ করি। সময়মতো সেহরি খাই এবং আল্লাহর কাছে নিজেদের গুনাহ মাফের জন্য প্রার্থনা করি। রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

সেহরির সময় যেসব আমল করা উচিত

১. ওজু করে পবিত্রতা অর্জন করা।
২. অন্তত দুই রাকাত তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার চেষ্টা করা।
৩. ধীরস্থিরভাবে সেহরি খাওয়া, তাড়াহুড়ো না করা।
৪. খাবার শেষে আল্লাহর শোকর আদায় করা।
৫. সহিহভাবে সেহরির দোয়া বা রোজার নিয়ত করা।
৬. ফজরের আজান হওয়ার পর জামাতের সাথে নামাজ আদায় করা।

এই আমলগুলো আপনার রমজানকে আরও বরকতময় করে তুলবে। আমরা যদি নিয়ম মেনে এবং সঠিক নিয়তে আমল করি, তবে ইনশাআল্লাহ পরকালে এর বিশাল প্রতিদান পাব।

শেষ কথা

পরিশেষে বলা যায়, রমজানের রোজা রাখা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। আর এই রোজার পূর্ণতা নির্ভর করে সঠিক নিয়ত ও সুন্নাত পালনের ওপর। সেহরির দোয়া এবং এর আনুষঙ্গিক নিয়মগুলো জানা প্রতিটি মুসলিমের জন্য জরুরি। আমরা যেন কেবল লোক দেখানো ইবাদত না করে, বরং বিশুদ্ধ অন্তরে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখতে পারি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে পুরো রমজান মাস সুস্থতার সাথে রোজা রাখার তৌফিক দান করুন এবং আমাদের সেহরি ও ইফতারকে কবুল করুন। আমিন।

Scroll to Top