রমজান নিয়ে কিছু ইসলামিক কথা: মাহে রমজানের গুরুত্ব ও ফজিলত ২০২৬

আমাদের প্রাণের মাস মাহে রমজান। শুধু পেট ভরা থাকা নয়, এই মাসে আমরা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব রকমের পানাহার এবং জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত থাকি। কিন্তু আপনি কি কখনো গভীরভাবে ভেবেছেন, রমজান নিয়ে কিছু ইসলামিক কথা বা এই রোজার প্রকৃত শিক্ষাটা আসলে কী? অনেকেই মনে করেন রোজা মানে শুধু খাবার না খেয়ে থাকার নাম। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে রমজান হচ্ছে আত্মশুদ্ধির এক সুবর্ণ সুযোগ। এটি শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা যা আমাদের ধৈর্য, সংযম এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের প্রশিক্ষণ দেয়।

এই মাস এলেই আমাদের মন-মানসিকতা যেন পাল্টে যায়। মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা বেড়ে যায়, কুরআন তেলাওয়াতের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে ঘর-দোর। কিন্তু শুধু অভ্যাসগতভাবে এই কাজগুলো করলেই কি আমরা রমজানের প্রকৃত মর্ম বুঝতে পারি? রমজানের শিক্ষা আমাদের সারাটা বছর পথ দেখাতে পারে, যদি আমরা এর মর্মবাণী অন্তরে ধারণ করতে পারি। আসুন, এই রমজানে আমরা শুধু রোজা না রেখে, রমজানের প্রকৃত শিক্ষাগুলোকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করি।

আরও জেনে নিনঃ রোজার সময়সূচি ২০২৬। ঢাকা ও ৬৪ জেলার সেহরি ও ইফতারের ক্যালেন্ডার

রমজানের রোজার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

রমজান মাস ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম। এই মাসে রোজা রাখা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান নর-নারীর ওপর ফরজ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অবলম্বন করতে পারো। (সূরা আল-বাকারা: ১৮৩)।

এই আয়াত থেকেই আমরা রোজার মূল লক্ষ্য বুঝতে পারি তা হলো তাকওয়া বা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। যখন একজন মানুষ আল্লাহর ভয়ে নিজের কাছে প্রিয় জিনিস অর্থাৎ খাবার ও পানীয় ত্যাগ করে, তখন তার মধ্যে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও ভীতি গভীরভাবে প্রোথিত হয়। এই অনুশীলন তাকে সারা বছর অন্যান্য পাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে সাহায্য করে।

রোজা শুধু পানাহার ত্যাগের নাম নয়

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা এবং মন্দ কাজ করা ছাড়েনি, তার এ পানাহার ত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (বুখারী)। এই হাদিস থেকে আমরা পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারি, রমজান নিয়ে কিছু ইসলামিক কথা বা শিক্ষা হলো শুধু পেটের রোজা নয়, বরং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেরও রোজা রাখা। আমাদের চোখকে খারাপ দৃশ্য দেখা থেকে বিরত রাখা, কানকে খারাপ কথা শোনা থেকে বিরত রাখা এবং মুখকে মিথ্যা, গিবত ও অশ্লীল কথা বলা থেকে বিরত রাখাই হলো রোজার প্রকৃত শিক্ষা। তাই রোজা রেখে আমাদের অবশ্যই এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

সাহরি ও ইফতারের আমল ও ফজিলত

রমজান মাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হলো সাহরি এবং ইফতার। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত মেনে এই দুটি সময় কাটালে আমাদের রোজা আরও পূর্ণতা পায় এবং আমরা অধিক সওয়াব লাভ করতে পারি।

শেষ রাতের বরকতময় আহার সাহরি

সাহরি হলো রোজা রাখার জন্য শেষ রাতে খাওয়া। রাসূল (সা.) সাহরি খেতে অত্যন্ত উৎসাহিত করেছেন এবং এতে বরকত রয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তোমরা সাহরি খাও, কেননা সাহরিতে বরকত রয়েছে। (বুখারি ও মুসলিম)। সাহরির সময় দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত। এই সময় আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে এসে বলেন, কে আছে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী? আমি তাকে ক্ষমা করব। কে আছে আমার কাছে চাওয়ার? আমি তাকে দান করব। তাই সাহরি খাওয়ার পাশাপাশি এই সময়টাতে ইবাদত-বন্দেগি করা এবং বেশি বেশি দোয়া করা উচিত।

দোয়া কবুলের সময় ইফতার

সারাদিন রোজা রাখার পর ইফতারের মাধ্যমে রোজা ভাঙা হয়। রাসূল (সা.) তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতে পছন্দ করতেন। ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া কবুল হয়। নবী করিম (সা.) বলেছেন, ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া ফেরত দেওয়া হয় না। (ইবনে মাজাহ)। তাই ইফতারের আগে momento গুলোতে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং সমগ্র উম্মতের জন্য ক্ষমা ও কল্যাণ কামনা করে দোয়া করা উচিত। ইফতারের পরের দোয়াটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ: আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিজক্বিকা আফতারতু।

রমজানে কুরআন তেলাওয়াত ও কিয়ামুল লাইল

রমজান মাস কুরআন নাজিলের মাস। এ মাসে ফেরেশতা জিবরাঈল (আ.)-এর সাথে রাসূল (সা.) কুরআন শুনাতেন ও শুনতেন। তাই এই মাসে কুরআন তেলাওয়াতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কুরআনের একটি অক্ষর পড়লেও নেকি হাসিল হয়, আর রমজানে এই নেকি বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়া হয়।

তারাবির নামাজ: কিয়ামুল লাইলের সুন্নত

রমজানের বিশেষ ইবাদত হলো তারাবির নামাজ। এটি কিয়ামুল লাইল বা রাতের নামাজের অন্তর্ভুক্ত। রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি রমজানে ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রাতের ইবাদতে (তারাবিতে) দাঁড়ায়, তার আগের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (বুখারি ও মুসলিম)। তারাবির নামাজ পড়ে আমরা শুধু গুনাহ মাফই করাই না, বরং কুরআন খতমের সৌভাগ্যও অর্জন করতে পারি। এটি আমাদের আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি করে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পথ সুগম করে।

শবে কদর: হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম একটি রাত

রমজান মাসের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে লাইলাতুল কদর বা শবে কদর অবস্থিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা এই রাতকে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম বলেছেন। এই একটি রাতে ইবাদত করা ৮৩ বছরের বেশি ইবাদত করার সমান। এই রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসেন এবং সকাল পর্যন্ত শান্তি বর্ষিত হয়।

রাসূল (সা.) এই রাতটি তালাশ করতে শেষ দশ দিন ইতেকাফ করতেন এবং সারারাত জেগে ইবাদত করতেন। আমাদের উচিত শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯) বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া, কুরআন তেলাওয়াত করা এবং তওবা-ইস্তেগফার করা। এই রাতে একটি ছোট্ট দোয়া বেশি বেশি পড়া উচিত, যা আয়েশা (রা.)-কে রাসূল (সা.) শিখিয়েছিলেন: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি। (হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।)

রমজানে দান-সদকার গুরুত্ব

রমজান মাস দান-সদকার মাস। রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল ব্যক্তি, আর রমজানে তার দানশীলতা বাতাসের চেয়েও বেশি প্রবাহিত হতো। এই মাসে একটি নফল সদকার সওয়াব ফরজ ইবাদতের সমান এবং একটি ফরজ ইবাদতের সওয়াব ৭০ গুণ বেড়ে যায়।

ফিতরা বা সদকাতুল ফিতর রমজানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দান। ঈদের নামাজের আগে এটি আদায় করা ওয়াজিব। এর মূল উদ্দেশ্য হলো রোজার কোনো ক্রটি-বিচ্যুতি পূর্ণ করা এবং গরীব-দুঃখীদের ঈদের আনন্দে শামিল করা। তাই রমজানে আমরা যাকাত, ফিতরা এবং সাধারণ সাদকা দেওয়ার মাধ্যমে গরীব-দুঃখীদের পাশে দাঁড়াতে পারি এবং সমাজে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি।

সংযমের মাসে আত্মশুদ্ধি অর্জন

রমজানের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো সংযম বা আত্মনিয়ন্ত্রণ। সারা দিন না খেয়ে থাকার ফলে আমাদের রাগ, হিংসা, লোভের মতো পশুবৃত্তিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। আমরা নিজেদের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে শিখি। এই সংযমের প্রশিক্ষণ আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে অসাধারণ পরিবর্তন আনতে পারে।

যে ব্যক্তি রমজানে অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে শিখেছে, সে আশা করা যায় সারা বছর অন্যায় থেকে দূরে থাকবে। যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ছেড়েছে রমজানের জন্য, সে বাকি এগারো মাসও সত্য কথা বলার চেষ্টা করবে। এই আত্মশুদ্ধিই হলো রমজান নিয়ে কিছু ইসলামিক কথার চূড়ান্ত লক্ষ্য। রোজা আমাদের তাকওয়া অর্জনে সহায়তা করে, যা আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের সাফল্যের চাবিকাঠি।

রোজা ভঙ্গের কারণ ও মাকরুহাত সম্পর্কে জ্ঞান রাখা

রমজানের রোজা সঠিকভাবে পালন করার জন্য রোজা কী কী কারণে ভেঙে যায় এবং কোন কাজগুলো রোজার জন্য ক্ষতিকর (মাকরুহ) তা জানা জরুরি। ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করলে, ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করলে, স্ত্রী সহবাস করলে রোজা ভেঙে যায় এবং কাফফারা ওয়াজিব হয়। ভুলে কিছু খেলে বা পান করলে রোজা ভাঙে না।

অন্যদিকে, অহেতুক কথা বলা, ঝগড়া করা, গিবত করা রোজার সওয়াব নষ্ট করে দেয়। এগুলো রোজা ভঙ্গ না করলেও রোজার পূর্ণতা লাভ করে না। তাই রোজা রেখে আমাদের এসব কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। এসব বিষয়ে সঠিক জ্ঞান রাখা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য, যাতে তারা তাদের রোজাকে আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে।

শেষ কথা

রমজান শুধু একটি মাস নয়, এটি মুমিনের জন্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এই মাস আমাদের শেখায় ধৈর্য, সহমর্মিতা, ত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি অগাধ ভালোবাসা। রমজান নিয়ে কিছু ইসলামিক কথা বা শিক্ষা শুধু মুখস্থ করার জন্য নয়, বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার জন্যই। আসুন, আমরা এই রমজানে শুধু রোজা না রেখে, রোজার প্রকৃত শিক্ষা অন্তরে ধারণ করি। কুরআন তেলাওয়াত করি, বেশি বেশি দান-সদকা করি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সাথে তারাবি পড়ি এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকি। এই রমজানকে করি আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ রমজান এবং চেষ্টা করি এর শিক্ষা সারা বছর বজায় রাখার। আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের পূর্ণ ফজিলত লাভ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

রমজানে রোজা রাখার মূল উদ্দেশ্য কী?

রমজানে রোজা রাখার মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন, “যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো।” (সূরা বাকারা: ১৮৩)। রোজা মানুষকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করার প্রশিক্ষণ দেয়, যা তাকে সারা বছর পাপকাজ থেকে দূরে থাকতে সহায়তা করে।

ভুলে কিছু খেলে বা পান করলে রোজা কি ভেঙে যায়?

না, ভুলে কিছু খেলে বা পান করলে রোজা ভাঙে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যদি কেউ ভুলে কিছু খেয়ে ফেলে অথবা পান করে ফেলে, তবে সে যেন তার রোজা পূর্ণ করে, কেননা আল্লাহই তাকে খাইয়ে ও পান করিয়েছেন। (বুখারি ও মুসলিম)।

শবে কদর কোন রাতে এবং এর বিশেষত্ব কী?

শবে কদর রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর (২১, ২৩, ২৫, ২৭ বা ২৯ তারিখ) যেকোনো একটিতে হয়ে থাকে। পবিত্র কুরআনে এই রাতকে হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম বলা হয়েছে। অর্থাৎ এই এক রাতে ইবাদত করা ৮৩ বছরের বেশি ইবাদত করার সমান সওয়াব পাওয়া যায়। এই রাতে ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে আসেন এবং শান্তি বর্ষিত হয়।

তারাবির নামাজের গুরুত্ব কী?

তারাবির নামাজ রমজানের বিশেষ ইবাদত। এটি কিয়ামুল লাইল বা রাতের নামাজের অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি রমজানে ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় তারাবির নামাজে দাঁড়ায়, তার আগের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। (বুখারি ও মুসলিম)। এটি পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।

সদকাতুল ফিতর কী এবং কেন দিতে হয়?

সদকাতুল ফিতর বা ফিতরা ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে দিতে হয়। এটি রোজার কোনো অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি-বিচ্যুতি পূর্ণ করার জন্য এবং গরীব-দুঃখীদেরও ঈদের আনন্দে শামিল করার জন্য দেওয়া হয়। রোজা রাখা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর এটি দেওয়া ওয়াজিব।

Scroll to Top