হোলি উৎসব কেন পালন করা হয়: রঙের উৎসবের ইতিহাস ও তাৎপর্য

বসন্তের আগমনে প্রকৃতি যখন নতুন সাজে সেজে ওঠে, ঠিক তখনই চারপাশ রাঙিয়ে দিতে আসে রঙের উৎসব হোলি। ছোট-বড় সবার কাছে এটি একটি আনন্দের দিন। কিন্তু আমাদের অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, আসলে হোলি উৎসব কেন পালন করা হয়? এটি কি কেবল রঙের খেলা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর রহস্য বা প্রাচীন ইতিহাস? আজকের এই লেখায় আমরা হোলি বা দোল পূর্ণিমার আদ্যোপান্ত নিয়ে আলোচনা করব।

হোলি উৎসবের সূচনা ও ইতিহাস

হোলি প্রধানত একটি হিন্দু ধর্মীয় উৎসব হলেও বর্তমানে এটি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বিশ্বজুড়ে পালিত হয়। এই উৎসবের মূল বার্তা হলো অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়। হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, এই উৎসবের সাথে বেশ কিছু পৌরাণিক কাহিনী জড়িয়ে আছে।

হোলি উৎসব কেন পালন করা হয়
হোলি উৎসব কেন পালন করা হয়

হিরণ্যকশিপু ও ভক্ত প্রহ্লাদের কাহিনী

হোলি উৎসবের সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনী হলো রাক্ষস রাজা হিরণ্যকশিপু এবং তার পুত্র প্রহ্লাদের গল্প। হিরণ্যকশিপু নিজেকে অমর মনে করতেন এবং চাইতেন সবাই যেন তাকে ঈশ্বর হিসেবে পূজা করে। কিন্তু তার নিজের ছেলে প্রহ্লাদ ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর পরম ভক্ত। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রাজা তার বোন ‘হোলিকা’র সাহায্যে প্রহ্লাদকে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করেন। হোলিকার কাছে একটি জাদুকরী কাপড় ছিল যা তাকে আগুনে পুড়তে দিত না।

হোলিকা প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে বসেন, কিন্তু অলৌকিকভাবে ভক্ত প্রহ্লাদ রক্ষা পান এবং হোলিকা আগুনেই ভস্মীভূত হন। এই দিনটিকে স্মরণ করেই হোলির আগের রাতে ‘হোলিকা দহন’ বা ‘ন্যাড়া পোড়ানো’ পালন করা হয়। এর মাধ্যমেই মূলত আমাদের মনের ভেতরের লোভ, হিংসা ও অশুভ চিন্তাকে পুড়িয়ে ফেলার প্রতীকী উৎসব পালন করা হয়।

রাধা-কৃষ্ণের প্রেম ও রঙের লীলা

হোলি উৎসবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বৃন্দাবনের রঙের খেলা। মনে করা হয়, শ্রীকৃষ্ণ তার গায়ের শ্যামলা রঙের জন্য মন খারাপ করতেন এবং রাধার ফর্সা গায়ের রঙের সাথে নিজের তুলনা করতেন। তখন মা যশোদা তাকে পরামর্শ দেন রাধার মুখে নিজের পছন্দমতো রঙ মাখিয়ে দিতে। শ্রীকৃষ্ণও রাধা ও গোপিনীদের সাথে রঙ নিয়ে মেতে ওঠেন। সেই থেকেই দোল বা হোলি উৎসবে রঙের ছোঁয়া লেগেছে।

ঋতু পরিবর্তনের গুরুত্ব

প্রকৃতির বিচারেও হোলি উৎসবের গুরুত্ব অনেক। শীতকাল শেষ হয়ে যখন বসন্তের আগমন ঘটে, তখন প্রকৃতিতে এক ধরনের জড়তা থাকে। এই সময় শরীর ও মনে নতুন উদ্দীপনা আনতে রঙের উৎসব দারুণ ভূমিকা রাখে। প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী, এই সময় ভেষজ রঙ (যেমন নিম, হলুদ বা পলাশ ফুলের নির্যাস) গায়ে মাখলে ঋতু পরিবর্তনের কারণে হওয়া বিভিন্ন চর্মরোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যেত।

আরও জানতে পারেনঃ শিবরাত্রি ২০২৬ সময়সূচি: তারিখ, পূজা বিধি, ব্রত নিয়ম

হোলি ও দোল পূর্ণিমার পার্থক্য

অনেকে হোলি এবং দোল পূর্ণিমাকে একই মনে করেন, তবে এর মধ্যে সূক্ষ্ম কিছু পার্থক্য আছে। বাংলাদেশে এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রধানত ‘দোল যাত্রা’ বা ‘দোল পূর্ণিমা’ পালিত হয়। এই দিনটিকে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্মদিন হিসেবেও পালন করা হয়। অন্যদিকে, উত্তর ভারতে ‘হোলি’ উৎসবটি অনেক বেশি ধুমধাম করে পালিত হয়। তবে দুটির মূল উদ্দেশ্যই হলো সম্প্রীতি ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।

আধুনিক জীবনে হোলি উৎসবের তাৎপর্য

বর্তমান ব্যস্ত জীবনে হোলি কেবল একটি ধর্মীয় রীতি নয়, বরং মানুষের সাথে মানুষের দূরত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার একটি মাধ্যম। এই দিনে পুরোনো সব বিবাদ ভুলে একে অপরকে আবির মাখিয়ে কোলাকুলি করে। এটি আমাদের শেখায় যে জীবনটা রঙের মতোই বৈচিত্র্যময় এবং সুন্দর।

হোলি খেলার সময় কিছু সতর্কতা

হোলি আনন্দের উৎসব হলেও আমাদের সচেতন থাকা জরুরি। বর্তমানে বাজারে অনেক রাসায়নিক যুক্ত রঙ পাওয়া যায় যা চোখের বা ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। তাই উৎসব পালনের সময়:

  • সব সময় প্রাকৃতিক বা হারবাল আবির ব্যবহার করুন।
  • চোখে যাতে রঙ না যায় সেদিকে খেয়াল রাখুন।
  • পশুপাখিদের গায়ে জোর করে রঙ দেবেন না।
  • অন্যের অনিচ্ছায় তাকে রঙ মাখানো থেকে বিরত থাকুন।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

হোলি উৎসব কবে পালিত হয়?

হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে হোলি বা দোল উৎসব পালিত হয়। এটি সাধারণত ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মার্চ মাসে পড়ে।

হোলিকা দহন কী?

হোলির আগের দিন সন্ধ্যায় শুকনো ডালপালা এবং কাঠ স্তূপ করে তাতে আগুন লাগানো হয়। এটি অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক। একেই হোলিকা দহন বা ন্যাড়া পোড়ানো বলা হয়।

হোলি খেলার আসল উদ্দেশ্য কী?

হোলি খেলার মূল উদ্দেশ্য হলো ভ্রাতৃত্ব বোধ জাগিয়ে তোলা, ভেদাভেদ ভুলে যাওয়া এবং আনন্দের মাধ্যমে নতুন ঋতুকে বরণ করে নেওয়া।

হোলি উৎসবকে রঙের উৎসব বলা হয় কেন?

এই উৎসবে আবির এবং বিভিন্ন তরল রঙের ব্যবহার করা হয় বলে একে বিশ্বব্যাপী ‘রঙের উৎসব’ বা ‘Festival of Colors’ বলা হয়।

শেষ কথা

হোলি উৎসব কেন পালন করা হয় তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এটি কেবল একটি পৌরাণিক কাহিনী নয়, বরং এটি সমাজ ও ব্যক্তির শুদ্ধিকরণের একটি প্রক্রিয়া। সত্যের জয় আর মিথ্যার পরাজয়ই হলো এই উৎসবের মূল ভিত্তি। আমরা যদি আমাদের মনের সংকীর্ণতা দূর করে একে অপরের প্রতি সহমর্মী হতে পারি, তবেই হোলি উৎসব পালন সার্থক হবে। তাই এবারের হোলিতে আপনার চারপাশ রাঙিয়ে তুলুন ভালোবাসা ও মানবতার রঙে।

Scroll to Top