একুশে পদক ২০২৬ বিজয়ীদের তালিকা

বাংলাদেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে একুশে পদক ২০২৬ একটি বিশেষ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। প্রতি বছর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করা হয়, তবে ২০২৬ সালের তালিকাটি গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে চমক সৃষ্টি করেছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার চূড়ান্তভাবে এই নাম ঘোষণা করে। এ বছর মোট ৯ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং ১টি সংগীত দল (ব্যান্ড)-কে এই মর্যাদাপূর্ণ পদকের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।

একুশে পদক ২০২৬ এর তালিকায় যেমন রয়েছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী, তেমনি রয়েছেন রক লিজেন্ড এবং জনপ্রিয় ব্যান্ড দল। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের পছন্দের শিল্পীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করায় এবারের একুশে পদক নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ তুঙ্গে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা ২০২৬ সালের একুশে পদক বিজয়ীদের তালিকা, তাদের পরিচিতি এবং কেন এবারের পদক প্রদান ঐতিহাসিক— তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

আরও জানতে পারেনঃ জিপিএফ এবং সিপিএফ এর জন্য মুনাফা হার 

একুশে পদক ২০২৬ বিজয়ীদের তালিকা

২০২৬ সালে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ যারা একুশে পদক পাচ্ছেন, তাদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা নিচে দেওয়া হলো। এই তালিকাটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী শতভাগ সঠিক।

ক্রমিকনামক্ষেত্রবিশেষ অর্জন/পরিচিতি
১.ফরিদা আক্তার ববিতাচলচ্চিত্রআন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী (‘অশনি সংকেত’ খ্যাত)
২.আইয়ুব বাচ্চু (মরণোত্তর)সংগীতএলআরবি ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ও রক লিজেন্ড
৩.ওয়ারফেজ (Warfaze)সংগীত (ব্যান্ড)দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো ব্যান্ডের এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
৪.শফিক রেহমানসাংবাদিকতাযায়যায়দিন পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক
৫.মেরিনা তাবাসসুমস্থাপত্যআগা খান অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী স্থপতি
৬.ড. মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তারচারুকলাবিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও অধ্যাপক
৭.অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আলম মজুমদারশিক্ষাবিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও গবেষক
৮.ইসলাম উদ্দিন পালাকারনাট্যকলাগ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পালাগান শিল্পী
৯.তেজস হালদার যসভাস্কর্যবিশিষ্ট ভাস্কর
১০.অথৈ আহমেদনৃত্যকলাপ্রতিশ্রুতিশীল নৃত্যশিল্পী

একুশে পদক ২০২৬ বিজয়ীদের বিস্তারিত পরিচিতি ও অবদান

পাঠকদের সুবিধার্থে এবং গুগল ডিস্কভারের পাঠকদের জানার আগ্রহ বিবেচনায় আমরা বিজয়ীদের প্রত্যেকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও অবদান সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করছি।

১. ফরিদা আক্তার ববিতা (চলচ্চিত্র)

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে ববিতা এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘অশনি সংকেত’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা চলচ্চিত্রকে তুলে ধরেছিলেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি বাংলা সিনেমায় অভিনয় করে আসছেন। তার অভিনয় দক্ষতা এবং চলচ্চিত্রের প্রতি নিষ্ঠা তাকে কিংবদন্তি তুল্য করে তুলেছে। একুশে পদক ২০২৬ প্রাপ্তি তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের এক বড় স্বীকৃতি। তিনি কেবল বাণিজ্যিক ছবিই নয়, বরং জীবনঘনিষ্ঠ সিনেমাতেও সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন।

২. আইয়ুব বাচ্চু (মরণোত্তর – সংগীত)

বাংলা রক সংগীতের কথা বললে যার নাম সবার আগে আসে, তিনি আইয়ুব বাচ্চু। ভক্তদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল তাদের প্রিয় এবি-কে যেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে এসে সেই দাবি পূরণ হলো। তিনি কেবল এলআরবি (LRB) ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতাই ছিলেন না, বরং গিটারের জাদুকর হিসেবে পুরো উপমহাদেশে পরিচিত ছিলেন। ‘চলো বদলে যাই’, ‘হাসতে দেখো’, ‘সেই তুমি’র মতো কালজয়ী গানগুলো তাকে অমর করে রেখেছে। মরণোত্তর এই পদক প্রাপ্তি তার পরিবারের জন্য এবং কোটি ভক্তের জন্য এক আবেগঘন মুহূর্ত।

৩. ওয়ারফেজ (Warfaze – সংগীত ব্যান্ড)

বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মিউজিক্যাল ব্যান্ডকে একুশে পদক দেওয়া হলো। এটি বাংলা ব্যান্ডের জন্য এক ঐতিহাসিক বিজয়। ১৯৮৪ সাল থেকে যাত্রা শুরু করা ওয়ারফেজ গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে হার্ড রক এবং হেভি মেটাল মিউজিককে বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে। ‘বসে আছি’, ‘অবাক ভালোবাসা’, ‘জীবন ধারা’র মতো গানগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোড়িত করেছে। ওয়ারফেজের এই অর্জন প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র এখন ব্যান্ড সংগীতকেও মূলধারার সংস্কৃতির অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে।

৪. শফিক রেহমান (সাংবাদিকতা)

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে শফিক রেহমান একটি স্বতন্ত্র নাম। তিনি ‘যায়যায়দিন’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তার প্রবর্তিত রম্য কলাম এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী লেখাগুলো পাঠকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। এছাড়াও বাংলাদেশে ‘ভালোবাসা দিবস’ বা ভ্যালেন্টাইনস ডে-এর প্রচলনে তার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে বলে জনশ্রুতি আছে। সাংবাদিকতায় তার দীর্ঘদিনের সাহসী ভূমিকা এবং নতুন ধারা প্রবর্তনের জন্য তাকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।

৫. মেরিনা তাবাসসুম (স্থাপত্য)

স্থাপত্যশৈলীতে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে সম্মানজনক স্থানে নিয়ে গেছেন মেরিনা তাবাসসুম। তিনি আগা খান অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী একজন স্থপতি। ঢাকার বায়তুর রউফ মসজিদের অনন্য নকশা তাকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছে। পরিবেশবান্ধব এবং স্থানীয় উপাদানে তৈরি তার স্থাপত্যগুলো আধুনিক বিশ্বের কাছে এক বিস্ময়। স্থাপত্যকলায় তার এই অসামান্য অবদানের জন্য ২০২৬ সালের একুশে পদক তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

৬. অন্যান্য গুণী ব্যক্তিত্ব

তালিকায় আরও রয়েছেন চারুকলার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, যিনি তার তুলির আঁচড়ে বাংলার প্রকৃতি ও জীবনকে ফুটিয়ে তুলেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য মনোনীত হয়েছেন অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আলম মজুমদার। গ্রামবাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য পালাগানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ইসলাম উদ্দিন পালাকার-কে এই সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে, যা লোকসংস্কৃতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাস্কর্য শিল্পে বিশেষ অবদানের জন্য তেজস হালদার যস এবং নৃত্যকলায় অথৈ আহমেদ এই পদক পাচ্ছেন।

আরও জানতে পারেনঃ  ২১শে ফেব্রুয়ারি মহান মাতৃভাষা নিয়ে কবিতা 

কেন এবারের একুশে পদক তালিকা ঐতিহাসিক?

২০২৬ সালের একুশে পদক তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি বিগত বছরগুলোর তুলনায় বেশ ব্যতিক্রমী। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবার প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে।

১. পপ কালচার ও ব্যান্ড সংগীতের স্বীকৃতি:

এতদিন একুশে পদক সাধারণত রবীন্দ্র সংগীত, নজরুল গীতি বা লোকসংগীত শিল্পীদের দেওয়া হতো। কিন্তু এবার ‘ওয়ারফেজ’ (Warfaze) এবং রক লিজেন্ড ‘আইয়ুব বাচ্চু’-কে এই পুরস্কার দেওয়ার মাধ্যমে প্রমাণ করা হলো যে, ব্যান্ড সংগীতও বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি তরুণ প্রজন্মকে দেশীয় ব্যান্ডের প্রতি আরও আগ্রহী করে তুলবে।

২. তারুণ্যের জয়গান:

অথৈ আহমেদের মতো তরুণ নৃত্যশিল্পীর নাম তালিকায় থাকা প্রমাণ করে যে, কেবল প্রবীণরাই নন, প্রতিভাবান তরুণরাও এখন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাচ্ছেন। এটি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা।

৩. বৈচিত্র্যময় ক্ষেত্র:

সাংবাদিকতায় শফিক রেহমানের মতো ভিন্নধারার লেখক এবং স্থাপত্যে মেরিনা তাবাসসুমের মতো আন্তর্জাতিক মানের স্থপতিকে নির্বাচন করার মাধ্যমে এই পুরস্কারের গ্রহণযোগ্যতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

একুশে পদক সম্পর্কে কিছু জরুরি তথ্য

পাঠকদের জানার সুবিধার্থে একুশে পদক সম্পর্কিত কিছু ঐতিহাসিক ও সাধারণ তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

  • প্রবর্তন ও ইতিহাস: ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগের স্মরণে ১৯৭৬ সালে এই পদক প্রবর্তন করা হয়। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা।
  • পুরস্কারের অর্থমূল্য: সর্বশেষ নীতিমালা অনুযায়ী, প্রত্যেক বিজয়ী পান একটি ৩৫ গ্রাম ওজনের ১৮ ক্যারেট স্বর্ণপদক, একটি সম্মাননা পত্র এবং নগদ ৪ লক্ষ টাকা।
  • প্রদান অনুষ্ঠান: সাধারণত প্রতি বছর ২০ বা ২১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ীদের হাতে এই পদক তুলে দেন। ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়ে থাকে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

একুশে পদক ২০২৬ কারা কারা পেলেন?

২০২৬ সালে মোট ৯ জন ব্যক্তি এবং ১টি প্রতিষ্ঠান (ব্যান্ড) একুশে পদক পেয়েছেন। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন ববিতা, আইয়ুব বাচ্চু (মরণোত্তর), ওয়ারফেজ এবং শফিক রেহমান।

ওয়ারফেজ কি প্রথম ব্যান্ড হিসেবে একুশে পদক পেল?

হ্যাঁ, বাংলাদেশের ইতিহাসে ওয়ারফেজ-ই প্রথম মিউজিক্যাল ব্যান্ড যারা দলগতভাবে একুশে পদক পাওয়ার গৌরব অর্জন করল।

একুশে পদক বিজয়ীরা কী কী পান?

বিজয়ীরা একটি স্বর্ণপদক, একটি সম্মাননা সনদ এবং নগদ ৪ লক্ষ টাকা পুরস্কার হিসেবে পান।

আইয়ুব বাচ্চু কি মরণোত্তর পদক পেয়েছেন?

হ্যাঁ, বাংলা রক সংগীতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুকে মরণোত্তর একুশে পদক ২০২৬-এ ভূষিত করা হয়েছে।

২০২৬ সালের একুশে পদক কবে ঘোষণা করা হয়?

৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, বৃহস্পতিবার সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই তালিকা ঘোষণা করে।

শেষ কথা

একুশে পদক ২০২৬ এর তালিকা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার গুণীজনদের সম্মান জানাতে কার্পণ্য করে না। বিশেষ করে আইয়ুব বাচ্চু ও ওয়ারফেজের মতো আধুনিক ধারার শিল্পীদের এই তালিকায় স্থান দেওয়া একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। এর মাধ্যমে কেবল শিল্পীদেরই নয়, বরং তাদের কোটি ভক্তকেও সম্মান জানানো হয়েছে। ববিতা, শফিক রেহমান কিংবা মেরিনা তাবাসসুমের মতো ব্যক্তিত্বরা তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছেন।

আমরা আশা করি, ২০ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে এই গুণীজনদের হাতে পদক তুলে দেওয়ার দৃশ্যটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এক স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকবে। রাষ্ট্র এভাবেই তার সূর্যসন্তানদের সম্মানিত করার ধারা অব্যাহত রাখুক— এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

Scroll to Top