বাংলাদেশের আবাসন খাতে দীর্ঘদিন ধরেই অর্থায়নের সংকট ছিল। নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক মানুষ ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছিলেন। এই বাস্তবতায় গৃহঋণের সুযোগ বাড়াতে বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী Home Loan বা গৃহঋণের সর্বোচ্চ সীমা দ্বিগুণ করা হয়েছে। আগে যেখানে একজন গ্রাহক সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পেতেন, এখন সেখানে সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত গৃহঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকছে। এই সিদ্ধান্ত আবাসন খাতে নতুন গতি আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও জানতে পারেনঃ ৩য় ও ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী কারা
বুধবার ৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে এই নির্দেশনা পাঠিয়েছে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, অবিলম্বে এই নতুন গৃহঋণ সীমা কার্যকর হবে। ফলে যারা বর্তমানে ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনায় আছেন, তাদের জন্য এটি একটি বড় স্বস্তির খবর।
গৃহঋণের সীমা বাড়ানোর কারণ
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে নির্মাণসামগ্রীর দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। রড, সিমেন্ট, বালি ও অন্যান্য উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির কারণে একটি মাঝারি মানের ফ্ল্যাট বা বাড়ি নির্মাণে আগের তুলনায় অনেক বেশি টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। এই অবস্থায় আগের ২ কোটি টাকার গৃহঋণ অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত ছিল না।
শহরাঞ্চলে জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাসনের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো নিজেদের বাসস্থানের জন্য ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। গৃহঋণের সীমা বাড়ানোয় এই শ্রেণির মানুষের জন্য বাড়ি কেনা আরও সহজ হবে।
আবাসন খাত শুধু ফ্ল্যাট বা বাড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে রড-সিমেন্ট শিল্প, ইঞ্জিনিয়ারিং, পরিবহন ও শ্রমবাজার। গৃহঋণের সীমা বাড়লে নতুন প্রকল্প শুরু হবে, যা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হবে।
আরও জানতে পারেনঃ তিতাস কমিউটার ট্রেনের সময়সূচী ২০২৬। Titas Commuter Train Schedule
নতুন গৃহঋণের সীমা ও শর্তাবলি
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, সব ব্যাংক একই পরিমাণ ঋণ দিতে পারবে না। একটি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার কত, তার ওপর নির্ভর করেই গৃহঋণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
| গৃহঋণ খাতে খেলাপি ঋণের হার | সর্বোচ্চ ঋণ সীমা |
|---|---|
| ৫ শতাংশ বা তার কম | ৪ কোটি টাকা (BDT 40 Million) |
| ৫ শতাংশের বেশি কিন্তু ১০ শতাংশের কম | ৩ কোটি টাকা (BDT 30 Million) |
| ১০ শতাংশের বেশি | ২ কোটি টাকা (BDT 20 Million) |
এই ছক থেকে বোঝা যায়, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ কম, তারা গ্রাহকদের বেশি গৃহঋণ দিতে পারবে। এতে ব্যাংকগুলোকেও খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
ডেবট-ইকুইটি রেশিও অপরিবর্তিত
গৃহঋণের ক্ষেত্রে ডেবট-ইকুইটি রেশিও আগের মতোই ৭০:৩০ রাখা হয়েছে। এর মানে হলো, কোনো ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি নির্মাণের মোট ব্যয়ের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ ব্যাংক ঋণ হিসেবে দেবে। বাকি ৩০ শতাংশ গ্রাহককে নিজস্ব অর্থ থেকে জোগান দিতে হবে। ডেবট-ইকুইটি রেশিও গ্রাহক ও ব্যাংক উভয়ের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। গ্রাহকের নিজের অর্থ বিনিয়োগ থাকলে ঋণ পরিশোধে তার দায়বদ্ধতা বাড়ে। অন্যদিকে ব্যাংকের ঝুঁকিও তুলনামূলক কম থাকে।বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, শুধু ঋণের সীমা বাড়ালেই চলবে না। ব্যাংকগুলোকে গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ভালোভাবে যাচাই করতে হবে।
গ্রাহকের নিয়মিত আয় আছে কি না, মাসিক কিস্তি পরিশোধ করার মতো Cash Inflow রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বেতন, ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ব্যবসার আয় এবং অন্যান্য আয়ের উৎস বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এই যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খেলাপি ঋণ বাড়ার ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে গ্রাহকরাও অতিরিক্ত চাপ নিয়ে ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকবেন।
গৃহঋণের সুদ হার কত হতে পারে
অনেকের মনেই প্রশ্ন, নতুন গৃহঋণের সুদ হার কত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো সুদ হার বেঁধে দেয় না। সুদ হার নির্ধারণের বিষয়টি ব্যাংক ও গ্রাহকের মধ্যে চুক্তির ওপর নির্ভর করে।
বর্তমানে বাংলাদেশে ঋণের সুদ হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক। কোনো নির্দিষ্ট ক্যাপ নেই। ব্যাংকগুলো তাদের তহবিল সংগ্রহের খরচ এবং নীতিগত সুদের হার বিবেচনা করে সুদ নির্ধারণ করে।
বর্তমানে অধিকাংশ বাণিজ্যিক ব্যাংকে গৃহঋণের সুদ হার সাধারণত ১২ শতাংশ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। ভালো গ্রাহক হলে বা দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক থাকলে কিছু ক্ষেত্রে সামান্য কম হারও পাওয়া যেতে পারে।
গৃহঋণের সুদ হার সাধারণত পরিবর্তনশীল হয়। অর্থাৎ বাজার পরিস্থিতি বদলালে ঋণের মেয়াদের মধ্যে সুদ হার বাড়তেও পারে, কমতেও পারে।
আরও জানতে পারেনঃ গণভোট কী: বাংলাদেশ ও বিশ্ব প্রেক্ষাপটে গণভোটের গুরুত্ব ও বাস্তবতা
কারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন
গৃহঋণের সীমা বাড়ানোর ফলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। যারা ঢাকাসহ বড় শহরে ফ্ল্যাট কিনতে চান বা নিজস্ব জমিতে বাড়ি নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এটি বড় সুযোগ।
রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোর বিক্রি বাড়তে পারে। নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগ্রহ বাড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রশ্ন-উত্তর
এখন থেকে সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত গৃহঋণ পাওয়া যাবে, ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হারের ওপর নির্ভর করে।
যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশ বা তার কম, তারাই সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা দিতে পারবে।
না, গৃহঋণের সুদ হার সাধারণত পরিবর্তনশীল এবং বাজারভিত্তিক।
মোট প্রকল্প ব্যয়ের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ গ্রাহককে নিজস্ব উৎস থেকে দিতে হবে।
শেষ কথা
বাংলাদেশ ব্যাংকের গৃহঋণের সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আবাসন খাতের জন্য একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ফ্ল্যাট কেনা ও বাড়ি নির্মাণ অনেকের জন্য সহজ হবে। তবে ঋণ নেওয়ার আগে নিজের আয় ও পরিশোধ সক্ষমতা ভালোভাবে বিবেচনা করা জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা ও সচেতন সিদ্ধান্ত নিলে এই নতুন গৃহঋণ নীতিমালা দেশের আবাসন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।


